আমাদির চোখ জুড়ানো মসজিদকুঁড় মসজিদ

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩২

কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে

এনামুল হক, খুলনা অফিস

সুন্দরবনঘেঁষা কয়রা উপজেলার সুপ্রাচীন জনপদ আমাদি। কপোতাক্ষ নদের পূর্বপাড়ের এই ইউনিয়নকে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ করেছে মসজিদকুঁড় মসজিদ। প্রাচীন এই মসজিদটিতে নির্মাণের নেই কোনো সাল ও তারিখ। ইট-সুরকির তৈরি মসজিদটি দক্ষিণ বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্নসম্পদ হিসেবে খ্যাত। প্রাচীন এই নিদর্শন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

জেলা শহর খুলনা থেকে ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে আমাদি ইউনিয়নের মসজিদকুঁড় গ্রামে প্রাচীন মসজিদকুঁড় মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটির কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ ও মসজিদকুঁড়ের নয়গম্বুজ মসজিদের গঠন প্রণালি ও স্থাপত্যে সাদৃশ্য থাকায় এটি খানজাহান আলী (র.) নির্মিত বা তার সমসাময়িক বলে ধারণা করা হয়। অপর একটি মত হচ্ছে, খানজাহান আলীর শিষ্য বুড়া খাঁ  ও ফতেহ খাঁ ১৪৫০-১৪৯০ সালের দিকে আমাদী গ্রামে কাছারি করে এলাকা শাসন করতেন। তারা এখানে একটি নয়গম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেন। যার নাম রাখেন মসজিদকুঁড় মসজিদ। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, ৪৫ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত পুরো মসজিদটি বর্গাকার। প্রতি পাশের মাপ হচ্ছে ১৬ দশমিক ৭৬ মিটার, ভেতরের মাপ ১২ দশমিক ১৯ মিটার করে। কেবলামুখী দেয়াল বাদে বাকি তিন দেয়ালে মসজিদে ঢোকার জন্য তিনটি করে খিলান প্রবেশদ্বার আছে। মধ্যের প্রবেশদ্বারগুলো অপেক্ষাকৃত বড়। কেবলামুখী দেয়ালে অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব তৈরি করা হয়েছে। মধ্যের মিহরাব অপেক্ষাকৃত বড়। মসজিদের ভেতরে চারটি স্তম্ভের ওপর ছাদ ভর করে আছে। এই চারটি স্তম্ভ মসজিদের ভেতরের অংশকে নয়টি সমবর্গক্ষেত্রে ভাগ করেছে। বর্গক্ষেত্রগুলো গম্বুজ দিয়ে ঢাকা। মসজিদটি একসময় টেরাকোটা দিয়ে সজ্জিত ছিল। এগুলোর অনেকটাই খোয়া গেছে। মসজিদের বাইরের দেয়াল দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দিকে পোড়ামাটির চিত্রফলক দ্বারা অলংকৃত ছিল। খিলান ও কার্নিসের ওপরেও অনুরূপ অলংকারের কাজ ছিল। অলংকৃতের মধ্যে আছে পদ্মফুল, মালা, বিলম্বিত রজ্জু ও ঘণ্টাসহ বিভিন্ন প্রতিকৃতি। চারটি প্রস্তর স্তম্ভ ও চারদিকের দেয়ালের ওপর খিলানের সাহায্যে নির্মিত হয়েছে মসজিদের নয়টি গমু্বজ। ভেতরের খিলান গমু্বজগুলোর নির্মাণকৌশল খুবই উঁচু মানের। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি অন্যগুলোর চেয়ে আকারে কিছুটা বড়।

মসজিদকুঁড় গ্রামের বাসিন্দা তায়েব আলী সানা জানান, প্রাচীন এ নিদর্শনটি দেখতে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে বহু মানুষ আসেন। আবার অনেকে আসেন নামাজ পড়তে। মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান বলেন, দেশের প্রচীনতম একটি মসজিদের দায়িত্ব পালন করতে পেরে নিজেকে সবসময় গর্বিত মনে করি। কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস জানান, সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে মসজিদকুঁড় মসজিদটির প্রতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব সময় খোঁজখবর রাখা হয়। খুলনা বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে মসজিদকুঁড় মসজিদের গায়ে মসজিদটির নির্মাণকালের ইতিহাস সংবলিত সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মসজিদটির ভেতরের কিছু অংশ সংস্কার করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুসারে আগামীতেও এর সংস্কার করা হবে। বর্তমানে মসজিদ কমিটির পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরও মসজিদটির দেখাশোনা করে। এছাড়া প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তিগুলো পরিদর্শন করা হয়।