সচেতন না হইলে মাথায় কাঁঠাল ভাঙিবেই

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩২

অর্থনীতিতে ‘চাহিদা’ ও ‘জোগান’ হাত ধরাধরি করিয়া হাঁটে। অর্থাত্ ‘চাহিদা’ না থাকিলে ‘জোগান’ কমিয়া যায়। আবার ‘জোগান’ কমিয়া গেলে ‘চাহিদা’ও ক্রমশ হ্রাস পাইতে থাকে। চারিদিকে যখন ভেজাল আর মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারে সয়লাব, তখন অনেকেই বলিয়া থাকেন, এই ভেজাল কমিবে না সহজে। কারণ, ভোক্তা সচেতন নহে, ইহাই ক্রয় করিতেছে। এখন ভোক্তা যদি ভেজালের ব্যাপারে সচেতন হইয়া অনিরাপদ খাদ্যপণ্য ক্রয় করা বন্ধ করে, তাহা হইলে বিক্রেতার কানেও পানি ঢুকিবে। কয়েক বত্সর পূর্বে যখন ফরমালিন দেওয়া আমের বন্যা বহিয়া যাইতেছিল দেশ জুড়িয়া, তখন বিষাক্ত জানিয়া যদি সম্মিলিতভাবে সকলে ঐসকল আম ক্রয় করা বন্ধ করিত, তাহা হইলে আমে ফরমালিন দেওয়া বাধ্য হইয়াই বন্ধ করিত ব্যবসায়ীরা। কারণ, পচনশীল পণ্য তো তাহারা দিনের পর দিন রাখিতে পারিবে না। ব্যবসায় ভোক্তার চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভোক্তারা তাহাদের এই শক্তি বিস্মৃত থাকে। সেই কারণে তাহার মাথায় কাঁঠাল ভাঙিতে পারে ভেজাল আর মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের উত্পাদক ও আমদানিকারকরা।

ভোক্তার এই সচেতনতার প্রয়োজন তাহার সুস্বাস্থ্যের স্বার্থেই। কে না জানে—সুস্বাস্থ্যের জন্য চাই স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাদ্য। অর্থাত্—নির্ভেজাল খাবার, সুস্থ জীবন। ভোক্তা যদি নিজেরাও সচেতন না হয়, তাহা হইলে শুধু আইন প্রয়োগ করিয়া ভেজাল আর মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব হইবে না। তাহার প্রমাণ মিলে কিছু পরিসংখ্যানে। যেমন—গত তিন বত্সরে বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), এলিট ফোর্স র্যাব এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কমবেশি ৮ হাজার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করিয়াছে। এই সকল অভিযানে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় প্রায় ২৫ হাজার মামলা হইয়াছে এবং প্রায় শতকোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হইয়াছে; কিন্তু তাহাতেও কি টনক নড়িয়াছে ভেজাল আর মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্যের কারবারিদের? দুশ্চিন্তার আরো জায়গা রহিয়াছে। একটি পণ্য খাবারের অনুপযুক্ত কি না—তাহা অনুধাবনের প্রধান একটি উপায় হইল উহার মেয়াদকাল দেখিয়া লওয়া। সেই ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কোনো ভোক্তা সহজেই এড়াইয়া যাইতে পারে; কিন্তু কিছু অসত্ ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা আরো ভয়াবহ একটি অপরাধ করিয়া থাকে। তাহারা মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্যের তারিখ মুছিয়া হালনাগাদ তারিখের সিলছাপ্পর বসাইয়া দেন। অর্থাত্ খাদ্যপণ্যটি মেয়াদোত্তীর্ণ হইলেও ভোক্তার তাহা বুঝিবার উপায় নাই। গত ১১ সেপ্টেম্বর র্যাবের ভেজালবিরোধী অভিযানে ধরা পড়ে কিছু প্রতিষ্ঠান।

মনে রাখিতে হইবে, খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তাহা হইলে ইহা আর ‘খাদ্য’ থাকে না। অনিরাপদ খাদ্য এখন সমগ্র বিশ্বেই জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হইতেছে। বিশ্বব্যাপী সকল সরকারই নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করিবার জন্য বহুবিধ প্রচেষ্টায় নিয়োজিত। শিল্পোন্নত দেশে খাদ্যবাহিত রোগের সংখ্যা ফি বত্সর ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইতেছে মর্মে তথ্য রহিয়াছে। উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা যে আরো অনেক অধিক নাজুক, তাহা সহজেই অনুমেয়। কেবল আইন ও কর্তৃপক্ষই শেষ কথা নহে, প্রতিটি ভোক্তাকে সকলের পূর্বে সচেতন হইতে হইবে নিরাপদ খাদ্য ক্রয় ও গ্রহণের ব্যাপারে। সকলের সম্মিলিত সচেতনতার ভিতর দিয়াই খাদ্যের নিরাপদ ব্যূহ তৈরি করা সম্ভব।