পাপিয়া দম্পতির ২৭ বছর জেল

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২০, ২২:৩৯

অস্ত্র মামলায় দুটি পৃথক ধারায় বহুল আলোচিত নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীকে ২৭ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল সোমবার দুপুর ২টায় ঢাকার এক নম্বর স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ এ রায় ঘোষণা করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে অস্ত্র মামলায় আলোচিত এই দম্পতির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হলো। দুটি ধারার মধ্যে একটিতে ২০ বছর, অন্যটিতে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এই দম্পতিকে। তবে দুটি সাজা একত্রে চলবে। ফলে তাদের ২০ বছরই সাজা ভোগ করতে হবে।

গতকাল রায় ঘোষণার আগে পাপিয়া ও সুমনকে এজলাসে তোলা হয়। রায় পড়ার সময় পাপিয়া নীরব ছিলেন। বিচারক যখন তাদের কারাদণ্ডের আদেশ দেন, তখন পাপিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর পুলিশ সদস্যরা তাকে কাঠগড়া থেকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারের উদ্দেশে নিয়ে যান।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, পাপিয়া ও সুমন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের রাজনীতিবিদ বলা যায় না। বরং তারা তথাকথিত রাজনীতিবিদ। তারা নিজেদের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন। কোনোভাবেই দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করেননি। এটা রাজনীতির জন্য কলঙ্কজনক। এ রায় রাজনীতিবিদদের জন্য একটা বার্তা।

আদালত আরো বলেছে, এই মামলার আসামিরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হলেও তারা সজ্জন রাজনীতিক নন। তাদের ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। একজন রাজনীতিকের বাসায় নগদ এত টাকা থাকার কোনো বৈধ উত্স তারা দেখাতে পারেননি। তারা রাজনীতিবিদ হলেও রাজনীতির ছদ্মাবরণে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন। তারা দেশের কল্যাণে কিছু করেননি। এ ধরনের রাজনীতিকের কাছে অস্ত্র থাকার কোনো ভালো উদ্দেশ্য থাকে না। তারা বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিদেশি অস্ত্র রাখেন। অস্ত্রের সঙ্গে ২০টি গুলি থাকা সেটাই প্রমাণ করে। তাই আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ও ১৯ (চ) ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে আসামি পাপিয়া নারী হওয়ায় এই আইনের ১৯(ক) ধারায় সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন থাকলেও ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। এছাড়া একই আইনের ১৯(চ) ধারায় সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হলো। দুটি সাজাই একত্রে চলবে।

আবেগী রায়

শামীমা নূর পাপিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া অস্ত্র মামলার রায়কে একটি আবেগী রায় বলে মন্তব্য করেছেন তার আইনজীবী শাখাওয়াত উল্লাহ ভূইয়া। গতকাল  রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। শাখাওয়াত বলেন, এ মামলার এক নম্বর সাক্ষী জব্দ তালিকা  প্রস্তুতকারী সাইফুল ইসলাম জবানবন্দিতে বলেছেন, অস্ত্র রান্নাঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এজাহার ও অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অস্ত্র ডাইনিং রুমের খাটের তোশকের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেই সাক্ষীকে রিকল করে এজাহার মোতাবেক সাজানো জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘এটি একটি আবেগী রায়। কারণ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, তিনি সজ্জন রাজনীতিক নন। কিন্তু এ মামলায় তিনি সজ্জন রাজনীতিক কি না, সেটা বিচার্য বিষয় ছিল না। অস্ত্র রাখার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এ বিচার হয়েছে। তাই আমরা আসামির সঙ্গে আলোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।

পেছনের কথা

গত ২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্বামী মফিজুর রহমান সুমনসহ পাপিয়া ও তাদের দুই সহযোগীকে আটক করে র্যাব। এ সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ১১ হাজার ৪৮১ ডলার, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কিছু মুদ্রা ও দুটি ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয়। পরে পাপিয়ার ফার্মগেটের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০টি গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড উদ্ধার করে র্যাব। অভিযান চালানো হয় পাপিয়ার নরসিংদীর বাড়িতেও। র্যাবের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়, পাপিয়া গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল ভাড়া নিয়ে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ চালিয়ে যে আয় করতেন, তা দিয়ে হোটেলে কোটি টাকার ওপরে বিল দিতেন। গ্রেফতারের পর পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে একটি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি এবং বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরেকটি মামলা করা হয়। বিমানবন্দর থানায়ও তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে একটি মামলা করা হয়। আর মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইনে সিআইডি আরেকটি মামলা করে। এরপর দুদকও পাপিয়ার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নামে।

এর মধ্যে শেরেবাংলা নগর থানার অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় গত ২৯ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দেয় র্যাব। ২৩ আগস্ট ঢাকা মহানগরের এক নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক পাপিয়া ও সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। পরে সাক্ষ্য গ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থনসহ রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য গতকাল দিন ঠিক করেন বিচারক।