আমি মান্নাকে নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার জীবনের পুরোটাই সিনেমা ছিল। আর কোনো নায়কের মধ্যে আমি এটি দেখি না। এখন তো নায়কদের ইনকামের অনেক মাধ্যম। নিজের সিনেমার খোঁজখবর তারা নেন না। নিজের ও অন্যের সিনেমা দেখা। নিজের ভুলগুলো সংশোধনের চেষ্টা। এগুলো নেই। — কাজী হায়াত্
বিশ্ব সিনেমা এখনো নায়ক নির্ভর। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির কালচার অনুযায়ি একজন প্রযোজক নায়কের ওপর অর্থ লগ্নি করে থাকেন। ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রিও সেই পথেই হাঁটছে এখনো। তবে বর্তমান বাজার হয়ে গেছে সংকুচিত। এক সময় প্রযোজকদের হাতে যেমন নায়ক নির্বাচনের অপশন থাকতো সেটিও কমেছে এখন। দীর্ঘদিন শাকিব নির্ভরতা থেকে বের হতে পারেনি প্রযোজকরা। হল মালিকদেরও চাহিদার শীর্ষে ছিলেন শাকিব খান। তার ঠিক আগে প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্না দীর্ঘদিন হাল ধরেছিলেন ইন্ডাস্ট্রির। তার পাশাপাশি অনেক চিত্রনায়ক ইন্ডাস্ট্রিতে থাকলেও শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়েছেন অনেকে। সেই সংকটের জায়গা থেকে মান্না ইন্ডাস্ট্রিতে অসংখ্য ব্যবসা সফল সিনেমা করেছেন। কিন্তু বর্তমানের চিত্রটা পাল্টেছে।
শাকিব খানের পাশাপাশি এই ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকদিন রয়েছেন চিত্রনায়ক ইমন, নিরব, সায়মন সাদিক, বাপ্পী চৌধুরী। ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের ক্যারিয়ারের বয়স এক যুগ বা তারও বেশি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দর্শক নির্ভরতা গড়ে উঠেনি তাদের নিয়ে। প্রযোজকরাও কখনো একাধিকবার তাদের ছবিতে লগ্নি করলেও দ্বিতীয় সিনেমা করার আস্থা পায়নি।
২০০৯ সালে ‘মন যেখানে হূদয়’ সেখানে সিনেমায় যাত্রা শুরু নিরবের। ক্যারিয়ারের দশ বছর পার করলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুপারহিট সিনেমা নেই তার। এমনকি কোনো পরিচালকও তাকে নিয়ে দ্বিতীয় সিনেমা নির্মাণ করেনি। যদিও পরিচালক রফিক শিকদার নিরবকে নিয়ে আরেকটি নির্মাণ করেছেন। কিন্তু সেটির মুক্তি আটকে আছে।
২০০৭ সালে ‘এক বুক ভালোবাসা’ সিনেমা দিয়ে চিত্রনায়ক হিসেবে অভিষেক হয় চিত্রনায়ক ইমনের। যদিও একই বছর তৌকির আহমেদ পরিচালিত ‘দারুচিনি দ্বীপ’ সিনেমায় অভিনয় করেন। নিরবের মত ইমনও ছোটপর্দা থেকে বড়পর্দায় ক্যারিয়ার শুরু করেন। কিন্তু ছোটপর্দায় তার যেই জনপ্রিয়তা ছিল সেটি বড়পর্দায় ছিল না। পরিচালকদেরও আস্থার জায়গায় নেই তিনিও। পরবর্তীতে তাকে ছোটপর্দায় আবার দেখা গেলেও বর্তমানে বড়পর্দাতেই চলছে তার ব্যস্ততা।
২০১২ সালে জাকির হোসেন রাজুর ‘জ্বী হুজুর’ সিনেমা দিয়ে অভিষেক সায়মন সাদিকের। আট বছরের ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত সিনেমার সংখ্যাটা বড় হলেও ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরায় ব্যর্থ তিনিও। যদিও ইন্ডাস্ট্রির বেহাল অবস্থা থেকেও ঝুলিতে বেশ কয়েকটি ব্যবসা সফল সিনেমা রয়েছে তার। এমনকি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। সিনেমা নিয়ে আলোচনায়ও এসেছেন অনেকবার। তবুও হল কেন্দ্রিক সিনেমা ব্যবসায় নিজের অভিনয়ের মুন্সিয়ানা দিয়েই জয় করতে হবে দর্শকদের আস্থা।
জাজ মাল্টিমিডিয়ার সিনেমা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে ২০১২ সালে যাত্রা শুরু বাপ্পী চৌধুরীর। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সুবিধায় অল্প সময়ে আলোচনায় বাপ্পী এলেও তার অভিনয় নিয়ে সমালোচনা রয়েছে এখনো। জাজ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরে তার ক্যারিয়ারের অবস্থাও ছিল নড়বড়ে। যদিও এখন আবারো ফিরতে চেষ্টা করছেন তিনি। নায়ক নির্ভরতা নিয়ে দুটি আলোচনা পরিপূরক। ইন্ডাস্ট্রিতে এত নায়ক থাকতেও পরিচালকরা আস্থাহীনতায় ভুগেন।
নির্মাতাদের কথা হাল ধরার মত নায়ক নেই। অন্যদিকে নায়করাও বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে বলেন তাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। দেশের গুণী নির্মাতা কাজী হায়াত বলেন, ‘আমি মান্নাকে নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার জীবনের পুরোটাই সিনেমা ছিল। আর কোনো নায়কের মধ্যে আমি এটি দেখি না। এখন তো নায়কদের ইনকামের অনেক মাধ্যম। নিজের সিনেমার খোঁজখবর তারা নেন না। নিজের ও অন্যের সিনেমা দেখা। নিজের ভুলগুলো সংশোধনের চেষ্টা। এগুলো নেই। ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরতে হলে নিজেকে আগে তৈরি করতে হবে।’
ইত্তেফাক/এসআই
