কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের এক অসহায় মা সোনিয়া খাতুন (২০)। তার কোলে একমাস বয়সি সন্তানের পিতৃত্বের দাবিতে পুলিশ, চেয়ারম্যান ও সমাজের মাতাব্বরদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।
থানায় মামলা করেও সরকারি দলের প্রভাব ও অর্থের কাছে হার মানতে হচ্ছে-এমন আশঙ্কা নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। চরম দরিদ্র ঘরের সোনিয়া খাতুন তার সন্তানের বাবার পরিচয়ের দাবি জানিয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে।
সোনিয়া খাতুন বলেন, ‘আমি তার (অভিযুক্ত) কাছে টাকা পয়সা কিছুই চাই না। তার (অভিযুক্ত) সম্পত্তির কোনো ভাগও আমি চাই না। স্ত্রীর দাবি নিয়েও কোনোদিন যাব না। খালি আমার কোলের এই সন্তানের বাবার স্বীকৃতিটুকু দিক। সন্তানের বাবার পরিচয় স্বীকার করে নিলেই আমি মামলা তুলে নিব। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করব না। আপনারা সন্তানের বাবার পরিচয়টা শুধু আদায় করে দেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওর (অভিযুক্ত) অনেক টাকা পয়সা, সম্পত্তি আছে। সরকারি দলের প্রভাব খাঁটিয়ে অনেক টাকা খরচ করে জামিনে বের হয়ে আমাকে হুমকি দিচ্ছে। মাইনসের কাছে কইছে আমার এই সন্তানের কোনো লাশও খুঁজে পাবে না। তাগরে ভয়ে আমি খুবই বিপদের মধ্যে আছি। কখন যেন আমাকে তুলে নিয়ে মেরে ফেলে।’
কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার বড়াইডাঙ্গি গ্রামের ঘটনা এটি। রাজীবপুর সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট সার ব্যবসায়ি মো. সিরাজদ্দৌলার (৪৭) বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে দীর্ঘ ৬ বছর ছিলেন সোনিয়া খাতুন। এ সুযোগে ভয়ভীতি দেখিয়ে সোনিয়াকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করত। এক পর্যায়ে সোনিয়া খাতুন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এসময় সোনিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় অভিযুক্ত ধর্ষকের পরিবার। এ ঘটনায় নির্যাতিত সোনিয়া খাতুন মো. সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলা দায়ের করে থানায়। চলতি বছরের ১ জুন তারিখে মামলার পর থেকে পালিয়ে ছিল অভিযুক্ত। গত মঙ্গলবার আদালত থেকে জামিনে এসে নির্যাতিত পরিবারটিকে হুমকি দিচ্ছে মামলা তুলে আনার জন্য। মীমাংশার জন্যও চাপ দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
একই গ্রামের মৃত খয়ের উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়া খাতুন। মা রেজিয়া খাতুন অন্ধ। চোখে দেখতে পারে না। এক মাত্র ভাই দিনমজুরি হিসেবে কামলা দিয়ে সংসার চালায়। চরম অভাবের মধ্যে থাকা নির্যাতিত সোনিয়ার অন্ধ মা রেজিয়া খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ঘটনার পর থিকা মাইনসের বাইত্তে কাজ করাও বন্ধ হয়ে যায়। এহন গ্রামের একজনের বাইত্তে খেয়ে না খেয়ে আছি। তাদের (অভিযুক্তের পরিবার) অনেক টাকা পয়সা জমি আছে। আমার বাবা মরা মেয়েডার সর্বনাশ কইরা দিছে। এহন আমগর চুপ থাকবার কয়। থানায় গেছি দেইখ্যা আমগর গেরাম থিকা বাইর কইরা দিবার হুমকি দিচ্ছে। আমার মেয়েডার বাচ্চা অইছে। তার বয়স এক মাস। এহন মেয়েডাক তো আর বিয়া দিবার পামু না। আপনাঘরে কাছে উচিৎ বিচার চাই।’
বড়াইডাঙ্গি গ্রামের প্রবীন স্কুল শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘নির্যাতিত পরিবারটি খুবই দরিদ্র ও অসহায়। মেয়েটিকে যে জোরপূর্বক ধর্ষণ করত সেটা তো এলাকার সবাই জানে। মেয়ের যে সন্তান জন্ম নিয়েছে তা অভিযুক্তের-এমন কথা বরাবরই বলছেন সোনিয়া খাতুন। অভিযুক্ত যেহেতু সরকারি দলের নেতা ও অর্থ সম্পদ রয়েছে সেহেতু নির্যাতিত পরিবারটি সঠিক বিচার পাবে কিনা তা নিয়ে আমরা আশংকা করছি। কেননা টাকার কাছে সবাই নিরব।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ধর্ষক সিরাজদ্দৌলা বলেন, ‘সম্পূর্ন বিষয়টা একটা চক্রান্ত। প্রতিবেশিদের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ছাড়াও রাজনৈতিক ভাবে প্রতিপক্ষরা মেয়েটিকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগ করেছে। আদালতের মাধ্যমে তার সুরাহা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই পরিবারটিকে আমি বা আমার স্বজনরা কেউ কোনো ধরণের হুমকি দেয়নি।’
রাজীবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নবীরুল ইসলাম বলেন, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে। দ্রæত অভিযোগপত্র আদালতে দাখিলের জন্য তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে একটু বলতে পারি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
