একসময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বড় সমস্যা ছিল সেশনজট। সেশনজটের কারণে শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে লেখাপড়া সম্পন্ন করিয়া কর্মজীবনে প্রবেশ করিতে পারিত না। ইহা ছিল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য এক দুঃসহ যন্ত্রণার কারণ। প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ ও বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষা বিকাশের পর এই ‘সেশনজট’ শব্দটা আমরা বলিতে গেলে ভুলিতে বসিয়াছিলাম। এমনকি বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া যেইখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজটের জন্য নিন্দিত ছিল, সেইখানেও পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়; কিন্তু এই বত্সর কোভিড-১৯ আসিয়া পুরাতন ক্ষতের কথা আবার মনে করাইয়া দিল। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ দীর্ঘদিন ধরিয়া বন্ধ থাকিবার কারণে উচ্চশিক্ষায় আবারও বড় ধরনের সেশনজটের আশঙ্কা করা হইতেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে চার শতাধিক পরীক্ষা স্থগিত হইয়াছে। এইখানকার ২৯ লক্ষ শিক্ষার্থী নূতন করিয়া সেশনজটের আশঙ্কায় রহিয়াছেন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইহারই মধ্যে তাহাদের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে জাঁকিয়া বসা সেশনজটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামিয়াছেন।
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করিতেছেন, এইখানে প্রতিটি বর্ষের শিক্ষার্থীরা গড়ে দুই হইতে তিন বত্সর করিয়া সেশনজটের কবলে পড়িয়াছেন। কথা ছিল, ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা হইবে। অথচ ১০ মাসেও তাহা প্রকাশিত হয় নাই। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় নাই এখনো। এদিকে এইচএসসি পরীক্ষা লইয়া অনিশ্চয়তার পর সরকার অটোপাশের ঘোষণা দিয়াছে। সকল কিছু ঠিক থাকিলে আগামী জানুয়ারি হইতে তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে পারিবেন। এই কারণে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করিবার চেষ্টা করিতেছে। তাহারা অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষার উপর জোর দিতেছেন; কিন্তু অনলাইন ক্লাসে এখন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরিয়া রাখা যাইতেছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের হার ৬০ শতাংশ হইতে ১০-২০ শতাংশেরও নিচে নামিয়া আসিয়াছে। ইহার কারণ-ডিভাইস সংকট, আর্থিক অসক্ষমতা, নেটওয়ার্ক সমস্যা, নির্দিষ্ট ক্লাস রুটিন ও শিক্ষা পরিকল্পনার অভাব ইত্যাদি। অবশ্য ইউজিসি দেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুসন্ধান চালাইয়া দেখিয়াছে, প্রায় ৪২ হাজার শিক্ষার্থীর ডিভাইস নাই। তাহাদের বিনা সুদে ঋণ দিয়া অনলাইন ক্লাসের আওতায় আনিবার পরিকল্পনা চলিতেছে, যাহা একটি ভালো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে।
সাধারণত সেশনজটের প্রধান একটি কারণ যথাসময়ে একাডেমিক কারিকুলাম শেষ না করা, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশে কালক্ষেপণ করা, শিক্ষকদের উদাসীনতা বা স্বল্পতা, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য ইহার পাশাপাশি অনেক শিক্ষকের বিদেশ গমন, সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি। তবে বর্তমানে এই সকল কিছুকে ছাড়াইয়া করোনা মহাদুর্যোগজনিত স্থবিরতা সেশনজটের বড় কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা অবশ্য গ্লোবাল ক্রাইসিস বা বিশ্বব্যাপী সংকট। এই সংকট হইতে উত্তরণে অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষাকে আমাদের সকলের পূর্বে গুরুত্ব দিতে হইবে। ইহা ব্যতীত সেশনজট হ্রাস করিতে প্রয়োজনে সেমিস্টারের ব্যাপ্তিকাল কমাইয়া আনা যায়। কারিকুলাম ছোট করিয়া সেমিস্টার করা যায় দুই বা তিন মাসের। শিক্ষকরা করোনার ক্ষতি পোষাইয়া লইতে ডাবল ক্লাস নিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গমনকারী দুই জন শিক্ষকের বিপরীতে এক জন অতিথি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায়। এই নীতি মানিলেও ইহার কার্যকর সমাধান হইতে পারে।
