চলার পথের কথা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪৩

এ এইচ এম নোমান

২০১৮ সালের ২৬-২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে আমেরিকার শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ৩য় বিশ্ব কংগ্রেস ‘Midwifery & Neonatal Nursing–2018’ এ ‘Neonatal Nursing is a Holistic Approach–Needs Bottom Lining’ উপস্থাপন করেছি, যা প্রকাশিত হয়েছে। কনফারেন্স শেষ করে শিকাগো থেকে কানাডার টরন্টোতে সামাজিক, পারিবারিক ও টরন্টো সিটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কাজে অংশগ্রহণ করেছি। টরন্টোতে প্রায় ২০ দিন অবস্থানকালে কিছু টুকরো বিচ্ছিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেছি। ঐ লেখার একাংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো।

শৃঙ্খলায় তৃপ্ত বেড়ি :রোজনামচা খিচুড়ি

তালহা ফারুক (২৬) Ryerson University থেকে  কম্পিউটার সাইন্সে স্নাতক (আন্ডার গ্র্যাজুয়েট) পাশ করে আইটি ফার্মে চাকরি করে। তানিম ফারুক (১৯) ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক ডিগ্রিতে লেখাপড়া করে এবং পাশাপাশি তালহাসহ আইটি ব্যবসা পরিচালনা করে এবং আয় করে। উভয়েরই সেলফ ড্রাইভিংয়ে গাড়ি আছে। অক্টোবর ২০১৮ থেকে তারা বাবা মি. আহসান ফারুক, মা আর ছোট ভাই তামের ফারুকসহ এজিন কোর্ট ইন স্কারবোরো আবাসিক এরিয়াতে কেনন গেটে বেশ বড় আকারের ইটের তৈরি ভাড়াবাড়িতে শিফট করেছে। এর আগে প্রায় ২৪ বছর ধরে স্কারবোরো এলাকার খ্যাতনামা আবুবকর মসজিদসংলগ্ন বাজার, ক্লিনিক, মল, ব্যাংক ইত্যাদি অনেক সুযোগবেষ্টিত তিন রুমবিশিষ্ট এক বাথরুম নিয়ে ভাড়া অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। মুশকিল ছিল পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারে মাত্র একটা বাথরুম। সমস্যা হয়। এ কারণেই প্রিয় জায়গা ছেড়ে ২০ মিনিট ড্রাইভিং দূরে বাসা পরিবর্তন করেছে। বাসা পরিবর্তন হওয়ায় ছেলে তামের David & Mary Collegiate Institute থেকে  Dr. Norman  Collegiate Institute-এ স্থানান্তিত হয়েছে। তামের ভর্তির  প্রথম দিনই জানায়, এ স্কুলটি আগেরটির তুলনায় ভালো। বছর শেষে একবারই ফাইনাল পরীক্ষা হয়। আর আগের স্কুলে পরীক্ষা সেমিস্টার সিস্টেমে ছিল। ওর বাবা আহসান ফারুক বললেন, এদেশে সেমিস্টার এবং বছর শেষে ফাইনাল-দুই নিয়মেই লেখাপড়া চলে। ছাত্র ও ছাত্রী নিজেদের জ্ঞান-মেধায় যে যে বিষয়ে পারদর্শী, সেদিকেই কর্তৃপক্ষ উত্সাহ দিয়ে থাকে। শিক্ষক বা অভিভাবকের কোনো ইচ্ছা বা চাপ ছাত্রছাত্রীর ওপর কার্যকর করে না।

১০ম গ্রেডে পড়ুয়া তামেরকে জিগ্যেস করলাম, দেশের জন্য কিছু বলতে—বলল, কিছু বলার নেই, বড় হলে দেশে যাবে। তার মা শাহনাজ বেগম আপাদমস্তক গৃহিণী। ১৯৯৮ সালে টরন্টোতে এসেছে, দেশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে কিছুই বলল না, শুধু চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে থালাবাসন, চামচ ধোয়াধুয়ি করছে। পাশে ওর ভাবি (আমার স্ত্রী), ভাই ফারুক ডাইনিং টেবিলে বসে, পুরোনো দিনের গল্প, সংসার এবং মা-বাবার কথা বলাবলি করছে। স্ত্রী ডা. রাজিয়া তার অসুস্থ মাকে শাহনাজ ঢাকা থাকাকালীন সময়ে অকৃপণ খেদমতের কথা স্মরণ ও বলাবলি করল।

ফারুক আগাগোড়াই অনেকটা উচ্চাভিলাষী বা দূরদর্শী কিন্তু কল্পনাবিলাসী; ফলে পরিবেশ, পরিস্থিতি, পুঁজি বা সমর্থন কোনোটাই কখনো খুব একটা পায়নি। তাই সফলতার পাল্লাও কম। যেমন, আশির দশকে ঢাকায় সে বোতলজাত পানির কারখানা দেওয়ার চিন্তা করল, আবার মোমবাতির কারখানার কথাও বলল, যুক্তি ছিল ঢাকা তথা দেশে সুপেয় পানির সংকট হবে তাই বোতলজাত পানির ব্যবহার বাড়বে এবং ব্যবসায়ও হবে। তখন ঢাকায় দু-একটা বোতলজাত পানির কারখানা হয়েছিল কি না মনে নেই, হলেও খুব প্রচার-প্রসার ছিল না। তেমনি বিদ্যুত্ ঘাটতি ও বিদ্যুত্ সরবরাহ সংকট থেকেই যাবে তাই বিপরীতে মোমবাতি খুব চলবে পাশাপাশি ব্যবসাও হবে। যতটুকু মনে আসে কাঁঠালবাগান বাড়িতে তখন এই লক্ষ্যে কড়াই মাল-মসল্লাও কিনেছিল,  প্রডাকশন বা বাজারজাতে গিয়েছিল কি না মনে নেই। মোটামুটি কোনোটাই হয়নি। অথচ সময়ের তাগিদে উভয়টা বিশেষ করে বোতলজাত পানির বাজার রমরমা, তখন সমর্থন ও পুঁজিও চেয়েছিল ৬০-৬৫ হাজার টাকা, তা পেল না তাই আর হলো না।

টরন্টো বাসিন্দা হয়েও সে পেট্রোল পাম্প, ডায়মন্ডের দোকান, পাইকারি মোবিল বেচাকেনা, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে স্ক্র্যাপ পাঠান। অত্যন্ত উদ্যোগী হয়েও যেমনটি শুরু করেছে তেমনি না শুরু হতেই শেষও হয়ে গেছে। কিন্তু হতাশ হয়নি। ভালোই আছে। তিন ছেলেকে লেখাপড়া রোজা, নামাজ, কোরআন শিক্ষাসহ আদব-কায়দায় ভালোই তৈরি করেছে। যেমন, টেবিলে কথায় কথায় বলছে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তার প্রধানমন্ত্রী ট্রুট এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির স্ট্যাটাস ছাড়া অন্য কারো বিষয়ে তার জানা নেই। আমাদের দেশের রাজনীতির ওপর তার উপদেশমূলক নানা ক্ষোভ ও অযাচিত মন্তব্য কে শুনল বা শুনল না তার কিছু আসে যায় না। একই সঙ্গে বলা যায় বিদেশের বাড়িতে যারা থাকে বিশেষ করে টরন্টোতে যত জনের সঙ্গে কথাবার্তা আলাপ-আলোচনা হয়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ দুই দেশ  সম্পর্কে নেতিবাচক নয় শুধু আজেবাজে মন্তব্য ও আড্ডাবাজি করে, এতে আমি খুবই বিব্রতবোধ করি ও কষ্ট পাই। অথচ রাজনীতি নিয়ে সরগরম থাকা নাগরিকরা সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকে। আমার উপস্থিতিতে টরন্টো যখন সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয় তখন খুব কম লোকই ভোটকেন্দ্রে গেছেন ও ভোট দিয়েছেন। অপরপক্ষে রীতিমতো তারা রেমিট্যান্স পাঠায় দেশে মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুর-শাশুড়ি ভিটেবাড়ির কথা বলে অনুভব করে গভীরভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতিতে আবদ্ধ হয়ে পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। কষ্ট বুকে বেঁধে অনেকেই দেশে আসেন আবার অনেকে একেবারেই না, হরেক রকম বর্ণনায় গাঁথা এ বেড়ি।   

n লেখক :প্রতিষ্ঠাতা ডরপ ও কলামিস্ট