একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক রশীদ হায়দার ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় রশীদ হায়দারের অবদান অনন্য। তার অসাধারণ কীর্তি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ১৩ খণ্ডের মুক্তিযুদ্ধের স্বজনহারাদের স্মৃতিচারণ ‘স্মৃতি ১৯৭১’, যাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘দালিলিক গ্রন্থ’ হিসেবে বিবেচনা করেন সমালোচকেরা। এছাড়া ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ’, ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মারকগ্রন্থ’ সম্পাদনাও তার উল্লেখযোগ্য কাজ। তিনি নেই কিন্তু তার কাজ ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণায় পথ দেখাবে। তার রচনা মানুষের হূদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে মেয়ে শায়ন্তী হায়দার ক্ষমার বাসায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে রশীদ হায়দার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। গত ফেব্রুয়ারিতে তার স্ট্রোক করে, এর পর থেকে তিনি আর হাঁটাচলা করতে পারতেন না। রশীদ হায়দার দুই মেয়ে হেমন্তী হায়দার হেমা, শায়ন্তী হায়দার ক্ষমাসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার স্ত্রী আনিসা আখতার ঝরা গত বছর মারা যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে বাদ জোহর আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
রশীদ হায়দারের মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোক জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রমুখ। এছাড়া বাংলা একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমিতে চাকরি নেন রশীদ হায়দার। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে তিনি অবসরে যান। পরে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে রশীদ হায়দারের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০-এর বেশি। ১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নানকুর বোধি’। বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘদিনের পেশাজীবনে তিনি সাহিত্যপত্র ‘উত্তরাধিকার’ সম্পাদনায় বিশেষ নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৭২ সালে দৈনিক সংবাদে ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন নিজের প্রথম উপন্যাস ‘গন্তব্যে’। পরে ১৯৮৬ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস আকারে ‘অসম বৃক্ষ’ নামে সেটি প্রকাশিত হয়। ‘খাঁচায়’, ‘নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য’, ‘উত্তরকাল’, ‘পূর্বাপর’, ‘মেঘেদের ঘরবাড়ি’, ‘বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প’, ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প’ তার উল্লেখযোগ্য বই। আর নাটক নিয়ে তার বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘নাটক :সেক্সপিয়র দ্য সেকেন্ড’, ‘তৈল সংকট’, ‘গোলাপ গোলাপ’ ও কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’-এর নাট্যরূপ ‘কাঠগড়া’।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে :‘বিবিধ :বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা (জীবনী)’, ‘অসহযোগ আন্দোলন :একাত্তর’, ‘শোভনের স্বাধীনতা’, ‘যুদ্ধ ও জীবন’ ইত্যাদি। রশীদ হায়দার মঞ্চে অভিনয়ও করেছেন। শুরুর দিকে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০১৪), হুমায়ুন কাদির পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
১৯৪১ সালের ১৫ জুলাই পাবনার দোহাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রশীদ হায়দার। তার পুরো নাম শেখ ফয়সাল আবদুর রশীদ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন হায়দার। ডাকনাম দুলাল। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তখনকার জনপ্রিয় সিনে ম্যাগাজিন চিত্রালীতে কাজ শুরু করেন রশীদ হায়দার। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ডের মুখপত্র ‘পরিক্রম’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
রশীদ হায়দারের ইন্তেকালে জেপির শোক
একুশে পদকপ্রাপ্ত রশীদ হায়দারের ইন্তেকালে শোক জানিয়েছে জাতীয় পার্টি-জেপি। গতকাল মঙ্গলবার এক শোক বার্তায় জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোক বার্তায় নেতৃবৃন্দ বলেন, রশীদ হায়দার একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব যিনি একাধারে লেখক, ঔপন্যাসিক এবং গবেষক ছিলেন। তার স্মৃতি: ১৯৭১ গ্রন্থে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা তুলে ধরেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য রশীদ হায়দার স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। নেতৃবৃন্দ মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
