শত্রুপক্ষের সুপার এডিটিংয়ের শিকার আমি :নিক্সন চৌধুরী

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২০, ২২:৫০

ফরিদপুর-৪ আসনের (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চর ভদ্রাসন) স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেছেন, ‘ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফোনালাপের একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ভয়েস (কণ্ঠস্বর) আমার নয়। শত্রুপক্ষ আমার একটি ফোনালাপ সুপার এডিট করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিয়েছে।’ সঠিক তথ্য জানতে ফরিদপুরের চর ভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) জিজ্ঞাসা করার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি সদ্য অনুষ্ঠিত চর ভদ্রাসন উপজেলার উপনির্বাচনে জেলা প্রশাসক পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে চর ভদ্রাসন উপজেলা পরিষদ উপনির্বাচনে ফরিদপুর জেলার জেলা প্রশাসকের পক্ষপাতমূলক আচরণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে ভাঙ্গা, সদরপুর ও চর ভদ্রাসনের জনগণের পক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ফরিদপুরের চর ভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) ফোনে গালিগালাজের যে অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, সে প্রসঙ্গে মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন আরো বলেন, ‘সংসদীয় আসনের তিন উপজেলার চর ভদ্রাসন ও সদরপুরের ইউএনও নারী আর ভাঙ্গার ইউএনও একজন পুরুষ। তাদের সঙ্গে ভাই-বোনের মতো সম্পর্ক। তাদের সঙ্গে মিলেমিশে এলাকার উন্নয়নে কাজ করছি। তাদের সঙ্গে কখনোই আমার কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি। তাদের এ ধরনের কথা আমি বলতেই পারি না। এটা পুরোপুরিভাবে এডিট করা হয়েছে। এমন আচরণ করার প্রশ্নই ওঠে না। ফোনালাপের এই অডিও ক্লিপটি মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। শত্রুপক্ষ এটা করেছে। আপনারা জানেন, কিছুদিন আগে ফরিদপুরে বরকত-রুবেলের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসন যে ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে আমি প্রথম সমর্থন করেছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমার বিরুদ্ধে অনেক বড় বড় নেতা আছেন সবাই এক হয়ে এই ষড়যন্ত্রটা করেছেন।’

মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেন, ‘নির্বাচনের দিন কেন্দ্রের মাঠে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়ায় আমাদের এক কর্মীকে গাড়িতে তোলেন ম্যাজিস্ট্রেট ও বিজিবি। বিষয়টি আমি প্রথমে এসিল্যান্ডকে ফোনে জানাই। তিনি বলেন, দেখতেছি। পরে এসিল্যান্ডের নম্বর বন্ধ পাই। এরপর আমি ইউএনওকে ফোনে বিষয়টি জানিয়ে বলি, সে কোনো অন্যায় করেনি, মাঠে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। তাকে বিজিবি ধরে নিয়ে গেছে। আপনি একটু ব্যবস্থা নেন। এর বাইরে যে বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে, সেগুলো এডিট করা। এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।’

গণমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা জিগ্যেস করেন, এই গালিগুলো আমি ইউএনওকে দিয়েছি কি না। সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করুন যে এই ভয়েসটা আমার। এই ক্লিপগুলো একেক জায়গা থেকে কেটে নিয়ে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য করা হয়েছে।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত গালিগালাজের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আর ইউএনওর কথাই শুধু ভাইরাল হয়নি, পুলিশ প্রশাসন ও ইউএনওর কথাও ভাইরাল হয়েছে। দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য কোনো মহল এই কাজটা করেছে। সরকারের দায়িত্ব এটা খুঁজে বের করা।’

মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘নির্বাচনের দিন ম্যাজিস্ট্রেট-বিজিবি দিয়ে দিনব্যাপী ভোটার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও তাণ্ডব চালিয়েছে। নৌকার ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এতে নেতাকর্মীরা উত্তেজিত ছিল। জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। প্রশাসনের অনুরোধেই তাদের শান্ত করার জন্য আমি নির্বাচনের রেজাল্টের পর সেখানে যাই। স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছি, যেন কোনো ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি না হয়। আমি উপজেলা থেকে তাদের সরিয়ে দুই কিলোমিটার দূরে তাদের শান্ত করার জন্য হাতজোড় করে অনুরোধ করেছি। কাউকে আইন হাতে তুলে না নেওয়ার অনুরোধ জানাই। কিন্তু ভিডিওতে সেই অংশটুকু কেটে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চর ভদ্রাসন থেকে আমার বাড়ি প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। নির্বাচন চলাকালে এমনকি নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার সময় আমি চর ভদ্রাসন এলাকায় যাইনি। ভোট শেষ হওয়ার পর প্রশাসনের তাণ্ডবে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের শান্ত করতে গিয়েছিলাম, সেটাও প্রশাসনের অনুরোধে। প্রশাসন আমাকে রিকোয়েস্ট করে নিয়ে গেছে।’

মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেন, ‘গত শনিবারের উপনির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের চাহিদার প্রেক্ষিতে ২৭ সেপ্টেম্বর চার জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয় জেলা প্রশাসন। নির্বাচনের আগের দিন কেন ১৩ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হলো? ইসির কি এবিষয়ক চিঠি আছে? নির্বাচনের দিন বিজিবিকে সঙ্গে নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটদের মারমুখী আচরণ করতে দেখা গেছে। যেখানে নৌকার ভোট বেশি, সেখানেই ম্যাজিস্ট্রেটরা বেশি তাণ্ডব করেছেন। এতে ভোটাররা ভীত হয়ে পড়ে। অনেক ভোটার ভোট দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কয়েকটি সেন্টারের বুথের ভেতরে ম্যাজিস্ট্রেটের পেশকারদের দেখা গেছে, যার প্রমাণও আমাদের কাছে রয়েছে। আমার অনেক কর্মীকে বিনা কারণে আটক করে জরিমানা করেন। তিন জন নৌকার এজেন্টকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন। বিষয়টা হলো ১৩ জন ম্যাজিস্ট্রেটকে আনা হয়েছে, অথচ বিগত দিনে যত নির্বাচন হয়েছে এক জন ম্যাজিস্ট্রেটের বেশি কাজ করেননি। এবার প্রতিটা সেন্টারে বিজিবি সদস্যদের নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করেছে যেন ভোটাররা না আসে। এর জন্য ডিসিরও বিচার চাওয়া আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী চর এলাকায়, সেখানে কোনো তাণ্ডবও করে নাই, সেখানে কোনো অ্যারেস্টও করে নাই।

তিনি বলেন, আরেকটা বিষয় আমি জানতে চাই, এই নির্বাচনে আপনারা খবর নিয়ে দেখবেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী একটা অভিযোগও করে নাই যে তাকে কেউ খারাপ আচরণ করেছে, নির্বাচনে কোনো বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, কেউ হুমকি দিয়েছে, কেউ কোনো ভয়ভীতি দেখিয়েছে। তাহলে চার জন ম্যজিস্ট্রেটের জায়গায় ইলেকশনের আগের দিন ১৩ জন কেন দেওয়া হলো? তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে বিএনপির বিদ্রোহীর পক্ষে কাজ করেন জেলা প্রশাসক।

তিনি বলেন, চরভদ্রাসন উপজেলা উপনির্বাচনে ফলাফল যা হয়েছে আমি সেটা সাদরে গ্রহণ করেছি। আমি কোনোভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করিনি। আর আমি যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করি, তাহলে ডিসিও আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। নির্বাচনের পরের দিন সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইউএনও আমার ভাঙ্গার বাড়িতে যান। নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইউএনও কোনোভাবেই আমার বাড়িতে আসতে পারেন না। জেলা প্রশাসকও নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। সারাদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে সেই ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ করতে অর্থাত্ আমি যেন বিষয়টি ওপর মহলে না জানাই সেজন্যই ইউএনওকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ডিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তার বিরুদ্ধেও ক্যাবিনেটে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আমি যদি কোনো আইন ভঙ্গ করে থাকি তবে অবশ্যই আমার বিরুদ্ধে মামলা হবে। তবে আমার একার বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে? আইন ভঙ্গ তো ডিসিও করেছেন।

মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেন, ‘আপনারা এখানে দেখতে পারবেন যে ইউএনওর সঙ্গে আমার আলাপটা দেওয়া হয়েছে। ইউএনও একজন বিসিএস ক্যাডার। যদি আমার সঙ্গে ইউএনওর কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া হয়, উনি তো আইন সম্পর্কে সব জানেন। হাইকোর্টে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে, রায় আছে সেখানে কারো ফোনের রেকর্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া যাবে না। আমার ইউএনও এত বোকা না, যে তিনি আইনের লোক হয়ে আইন ভঙ্গ করে সোস্যাল মিডিয়াতে এটা দিয়ে ভাইরাল করবেন। এখন পর্যন্ত আমার ইউএনওর কোনো বক্তব্য কিন্তু আসেনি।’

মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেন, ‘বিগত সাত বছর স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। এর আগে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাচনে আমি আমার স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছি। এবার আমি নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ায় একটি মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত যার পরিপ্রেক্ষিতে সদ্য অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। নিক্সন চৌধুরী বলেন, ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। তবে উপনির্বাচনে যারা পক্ষপাতিত্ব করেছে তাদের বিচার হোক এবং আমাকে নিয়ে যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা হচ্ছে সেটারও বিচার হোক।’

ডিসির অপকর্মের ফোন রেকর্ড আছে, প্রয়োজনে জায়গামতো দেব

মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিসির নানা ধরনের অপকর্মের নির্দেশনার অডিও রেকর্ড আছে। ডিসি ও ইউএনও আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ম্যাজিস্র্বেট নিয়োগের ব্যাপারে অনেক রেকর্ডিং আছে আমি তো সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়াতে দিচ্ছি না। আমি তো হাইকোর্টের রুল অবমাননা করতে পারি না। যেই ক্লিপগুলো অনিয়ম করার জন্য ডিসি ইউএনওকে প্রেশার করেছে, সেই ক্লিপগুলো আমার কাছে আছে। আমি জায়গা মতো সেই ক্লিপগুলো অবশ্যই দেব, যদি আমার দরকার মনে হয়। সারা দেশের মানুষকে জানাতে চাই, আমার সঙ্গে কী হয়েছে, আমার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কী হয়েছে। আমি কিন্তু ইউএনওর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারতাম আইসিটি আইনে, হাইকোর্টের রুল আবমাননা করে কেন আমার অডিও প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমি জানি ইউএনওর সঙ্গে আমার এমন কোনো কথা হয় নাই যেগুেলো প্রকাশ হয়েছে। তাই আমি করিনি।’ 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভাঙ্গা উপজেলার প্রাক্তন চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন, ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফায়জুর রহমান প্রমুখ।