হেনা সুলতানা
এই প্রথম বাসা থেকে বের হওয়া। অনেকদিন পর।
একরকম চুপিসারেই বেরিয়ে আসে সে। এখন বাসার সবাই ঘুমের ঘোরে। কাল আড্ডা চলেছিল অনেক রাত অবধি মা-র ঘরে। কত গল্প, কত হাসাহাসি, কত গড়াগড়ি, কত মসলা চায়ের ছড়াছড়ি। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে পারিবারিক কত প্রত্নতত্ত্বের-নৃতত্ত্বের কাহিনি।
করোনাকালের পথঘাট সব সুনসান। হঠাত্ দু-একটা গাড়ি ছুটে যায় হুসহাস। বুক কাঁপিয়ে অ্যাম্বুলেন্স। সেই দুপুর থেকে ঘুরছে সে। এ এলাকা তার একেবারেই অপরিচিত। পুরানো ঢাকার এক অখ্যাত অঞ্চল। এখন বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। ঠিকঠাক ঠিকানা না থাকলে কোনো বাড়ি খুঁজে পাওয়া সোজা কথা নয়। বড় ক্লান্তি লাগছে। কেউ একজন বললে এই বিলডিংটার পাশ দিয়ে সোজা গিয়ে বাঁদিকের গলির মুখে, ওখানে কাউকে জিজ্ঞেস করলে কিছু একটা সন্ধান মিলতে পারে। এরকম অদ্ভুত নামের বাড়িগুলি ওদিকেই দেখা যায়। ওসব নামধামও তো উঠে গেছে কবেই।
এতোটা পথ, গলির মুখে আসতেই তার দম বন্ধ হয়ে আসে। ড্রেন আর সুয়ারেজের ময়লায় থিকথিক করছে সারা রাস্তা। রোগ-জীবাণুতে ভারী হয়ে আছে বাতাস। অ্যাডিস মশার পাকা ঘর-সংসার। কোনো জায়গায় অ্যাসিডের মতো তীব্র কালো জল। অসম্ভব ঝাঁজালো গন্ধ। এ মাস্কের কাজ নয়। পকেট থেকে রুমাল বের করে সে। বেশ কিছু ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা। ওদের অবয়ব অনেকটা মহাশূন্যের কালো গহ্বরের মতোই।
সন্ধ্যার আলো-আঁধারে এ এলাকার বাড়িগুলো ভয়ঙ্কর সব জন্তুর মতো মনে হচ্ছে। কোন কালে এদের গায়ে সিমেন্ট-বালির কোনো প্রলেপ পড়েছিল কি না কে জানে। বট-অশত্থের দখলে বাড়িগুলো চেনা খুব মুশকিল। লাইটপোস্ট আছে কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তার মনে হয় কোনো প্রাগৈতিহাসিক নিঝুমপুরীতে ঢুকে গেছে সে।
এই আলো-আঁধারিতেই তাকে খুঁজে নিতে হবে ‘গোময়ী’ বাড়িটিকে। খুঁজতে খুঁজতেই তো চলে এসেছে এ এলাকায়। চার মহলার একটি বাড়ির সামনে একবার থমকে দাঁড়ায় তারপর উঁকি দেয় সে ভিতরে। হ্যাজাকবাতি হাতে একটা লোক। তার পিছনে কয়েকজন। লাল শাড়িপরা একটি মেয়ের হাত ধরে একটি ছেলে, পরনে সাদা পাঞ্জাবি। বিয়ের আসর থেকে সদ্য বিবাহিত দম্পতি ফিরছে। সেই উজ্জ্বল আলোতে দেখা একজন বয়স্ককে সুধায়, এই বাড়িটাই কী...
—গোময়ী ভবন।
—বকুলদিদি নামে কেউ?
যতটা কঠিন ছিল বাড়িটা চিনে নেওয়া ততটাই সহজ হলো বকুলদিদিকে খুঁজে পাওয়া।
—ঐ তো ঐ ঘরটাতে।
টিমটিম করে হারিকেন জ্বলছে। চৌকির ওপরে শুয়ে অশীতিপর এক নারী। কাছে গিয়ে হাতটি স্পর্শ করে সে। চোখ মেলে তাকায়।
—কে?
—আমি বিভুপতির নাতি।
—দাদার...
—চলো আমার সাথে।
—না। স্বামীর ভিটে! এখানেই...
বকুলদির হাতটি ধরে বিদঘুটে এক রাত পার করে সে। আঁধার কাটতে থাকে। এক সদ্য নবজাতকের কান্নায় ঘুম ভাঙে তার।
বরফ-শীতল বকুলদির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
বকুলদি বহুবছর আগে এ বাড়িরই একটি ছেলের সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল। আর ফেরেনি।
