বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভিন্ন ভাবনা

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪৬

ড. মো. নাছিম আখতার

করোনায় ৪ লাখ প্রবাসী নিঃস্ব, আসছেন আরো। ফেরত আসা প্রবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশে ফিরে কাজ পাচ্ছেন না। অনেকে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। ফিরে আসা কর্মীদের নিয়ে তিনটি সংস্থার জরিপে বলা হচ্ছে, জীবিকার সংকটে রয়েছে শতকরা ৭০ শতাংশ, ৬১ শতাংশ পরিবারে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি এবং ৮৭ শতাংশের আয় নেই। এমন পরিস্থিতিতে যুবসমাজের কর্মহীনতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠছে অশুভ সিন্ডিকেট। যারা বিভিন্ন প্রলোভনে চাকরি দেওয়ার নামে গ্রামের সহজসরল মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে। যা সমাজকে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল করে তুলছে। এমতাবস্থায় দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আমাদেরকে নিতে হবে দূরদর্শী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনার তিনটি পর্যায় থাকবে। প্রথমত সরকারি চেষ্টায় ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের কূটনৈতিক মিশন চালু করা এবং যেগুলোতে মিশন রয়েছে সেখানে কর্মকাণ্ড জোরদার করা। দ্বিতীয়ত প্রবাসে জীবিকা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ঝামেলাবিহীন জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের ব্যবস্থা থাকলেই সেখানে কর্মী পাঠানো। তৃতীয়ত মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে যুবসমাজকে জানানোর ব্যবস্থা করা। এতে তাদের মধ্যে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জনগণ দীর্ঘ দিন আগেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চাকরি ও ব্যবসায় ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে তারা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। তথ্যমতে আফ্রিকা মহাদেশে ৩০ লাখ ভারতীয় বিভিন্ন পর্যায়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। একটি পরিসংখ্যান মতে—উগান্ডার ৫০ জন শ্রেষ্ঠ ধনীর মধ্যে তিন জন ভারতীয়। কেনিয়াতে প্রথম ২০০ জন ধনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভারতীয় রয়েছেন। আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার নামের দেশটি ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। সেখানকার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এখন ভারতীয়দের হাতে। প্রায় ২৫ হাজার ভারতীয় মাদাগাস্কারে বসবাস করেন। এদের হাতেই রয়েছে সেখানকার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ। তাহলে কী দাঁড়াল? সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের রোডম্যাপ যথার্থ হলে যে কোনো দেশেই প্রবাসী হিসেবে উন্নতি করা সম্ভব। তাছাড়া এসব দেশ এখনো উন্নয়নশীল। লোকসংখ্যা কম, প্রাকৃতিক সম্পদ অজস্র, শিক্ষিতের হার কম। তাই এই দেশগুলিতে ব্যবসায় ও চাকরির ক্ষেত্রে সহজে উন্নতি করা সম্ভব। বহুল জনসংখ্যার কারণে প্রতিযোগিতাময় জীবনযাপনে আমরা অভ্যস্ত। এমন কর্মঠ ও কষ্টসহিষ্ণু যুবসমাজকে যেখানে নিয়োগ দেওয়া যাবে সেখানেই তারা ভালো করবে। শুধু দরকার এদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই শ্রমবাজার খুঁজে বের করা। এক্ষেত্রে দরকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও দূরদর্শিতা।

সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকার খবরের শিরোনাম—‘অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকের বিশ্বে কূটনৈতিক মিশনগুলোর দায়িত্ব পরিবর্তিত হয়েছে। এখন রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতি অবলম্বন করতে হবে, যাতে আমরা দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য জোরদার করতে পারি ও বিশ্বের সবার সঙ্গে একত্র হয়ে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারি।’ তার বক্তব্যের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। এক্ষেত্রে আমাদের নীতিনির্ধারকদের মানসিক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। তাদেরকে অনুধাবন করতে হবে বাঙালির কর্মক্ষেত্রে ও ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসারের জন্য ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও রয়েছে অবারিত দ্বার। বিষয়টি গভীর জীবনবোধ নিয়ে ভাবতে হবে। চায়নিজ ও ভারতীয়দের মতো অর্থনৈতিক কূটনীতি গ্রহণ করতে হবে। উন্নত বিশ্বের যে কোনো দেশে গেলেই ‘চায়না টাউন’ নামে বসবাসের জায়গা পাওয়া যায়। যেখানে চায়নিজরা সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালিত করে। ভারতীয়রাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। পিছিয়ে আছি আমরা। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় বাংলাদেশিরাও কাজ করে। সেখানে যারা গিয়েছেন তারা তাদের আত্মীয়পরিজনের হাত ধরে অথবা নিজস্ব চেষ্টায়। সরকারের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই দেশগুলোতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পাঠানোর প্রক্রিয়া জোরদার করা দরকার।

কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি শুরু করার ক্ষেত্রে ঐ দেশের গড় মাথাপিছু আয় বড় ভূমিকা রাখে। আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশেই গড় মাথাপিছু আয় আমাদের দেশের চেয়ে তিন গুণ থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশি। এসব দেশে যুব সমাজকে কাজ দিতে পারলে দেশ উপকৃত হবে এবং যুবসমাজ মাদক ও বিপথগামিতা থেকে রক্ষা পাবে। পৃথিবীতে এমনো দেশ আছে যার আয়তন বাংলাদেশের দ্বিগুণ; কিন্তু লোকসংখ্যা মাত্র ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ এবং প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। এসব দেশের শান্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের সুযোগ নিচ্ছে ভারতীয়রা। সেখানে ভারতীয় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ আফ্রিকার গ্যাবন নামের দেশটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এমন সব দেশ সম্পর্কে আমাদের নীতিনির্ধারকদের জ্ঞানার্জন করতে হবে। আমার মতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকা উচিত। এর সদস্য হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল, অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞানের অধ্যাপকগণ। তারা মতামত দিবেন আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার কোন কোন দেশে অর্থনৈতিক কূটনীতি পরিচালনা করা যায়।

২০২০ সালের ব্যবসায়বান্ধব দেশের তালিকায় পৃথিবীর ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। আন্তর্জাতিকভাবে পৃথিবীর দেশগুলোর ব্যবসায়বান্ধব পরিবেশকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যথা: খুব সহজ, সহজ, মধ্যম এবং নিম্নমধ্যম প্রকৃতির। তালিকাটি  বিশ্লেষণ করলে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশের নাম দেখতে পাই, যেগুলো ব্যবসায়বান্ধব পরিবেশের কাতারে ‘সহজ’ শ্রেণিভুক্ত। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কেনিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, পেরু, তিউনিসিয়া, সাউথ আফ্রিকা, জাম্বিয়া, বতসোয়ানা এবং টোগো। এই দেশগুলো সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিহ্নিত হওয়া দরকার। সেখানে আমাদের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় পরিচালনা করার জন্য উত্সাহিত করা যেতে পারে।

বিপুল জনসংখ্যার কারণে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে সমাজ হয়ে পড়বে কর্মহীন লোকের দ্বারা ভারাক্রান্ত। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতির ওপর এবং পরোক্ষ প্রভাব পড়বে সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর। তাই সচেতন মানুষ যাদের কর্মকাণ্ড দেশের সার্বিক পরিবর্তনে অবদান রাখতে পারে তাদের স্লোগান হওয়া উচিত—‘দূরদর্শী পরিকল্পনা করি, সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি’।

n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭