প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২০, ২১:১৮

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বয়সভেদে বেশ তারতম্য লক্ষ্য করা যাইতেছে। দেশ ও অঞ্চল ভেদে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে ভিন্নতা দেখা গেলেও প্রবীণ জনগোষ্ঠীই অধিকতর মৃত্যুঝুঁকিতে রহিয়াছে যাহা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক উপাত্তেও লক্ষ্যণীয়। বাংলাদেশেও করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি অধিক প্রবীণ এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর। দেশে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হইয়া যাহাদের মৃত্যু হইয়াছে তাহাদের ৭৮ শতাংশের বয়সই ৫০ বত্সরের উপরে। এখনো করোনায় আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে আসা রোগীদের বড় অংশই প্রবীণ এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী। তাহাদের মধ্যে আবার অধিকাংশেরই অন্যান্য রোগের জটিলতা রহিয়াছে। দেখা যাইতেছে—বয়স্ক রোগীদের জন্য হাসপাতালগুলিতে বিশেষায়িত সেবা না থাকায় তাহারা হয়রানির শিকার হইতেছেন এবং উপযুক্ত চিকিত্সা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন।

শঙ্কার বিষয় হইল, দেশে প্রবীণ এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য তেমন কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল কিংবা হাসপাতালগুলিতে জেরিয়াট্রিক সেবা বিদ্যমান নাই। ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত প্রবীণ হিতৈষী সংঘ পরিচালিত হাসপাতালটি দেশের একমাত্র জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল। অতি সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক বিভাগ খোলা হইলেও সুযোগ-সুবিধা সীমিত। বাংলাদেশে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে পড়াশুনার কোনো ব্যবস্থাই নাই। সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও এই বিষয়ে নাই কোনো আলাদা ইউনিট।

বাংলাদেশে ষাটের উপরে যাহাদের বয়স তাহাদের প্রবীণের মর্যাদা দেওয়া হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে প্রবীণ বা বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা রহিয়াছে ১ কোটি ৩০ লাখের মতো। জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর হিসাবে ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রবীণদের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ছাড়াইয়া যাইবে। ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে দেশে তেমন কোনো বিশেষায়িত সেবাপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া না উঠিবার বিষয়টি উদ্বেগজনক। অধিক বয়সি বা প্রবীণরা নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগিয়া থাকেন। ডায়াবেটিস বা হূদেরাগের মতো জটিল অসুখ তো রহিয়াছেই, পাশাপাশি হাড়ে ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা—এই সকল অতি সাধারণ বিষয়। অল্প বয়সে একজন মানুষের যে শারীরিক গঠন বা ক্ষমতা থাকে; বয়স্কদের তাহা থাকে না।

ষাটোর্ধ্বদের ক্ষেত্রে বার্ধক্যজনিত রোগের কারণে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতির ঝুঁকি অধিক থাকে। করোনায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এই সকল বয়স্ক মানুষের সমন্বিত উন্নত চিকিত্সার সুযোগ থাকা দরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জেরিয়াট্রিক চিকিত্সাসেবা যত্সামান্য ব্যবস্থা থাকিলেও সেইখানে আবার করোনা আক্রান্তদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা নাই। আসন্ন শীতকালে বয়স্কদের বার্ধক্যজনিত রোগের পাশাপাশি করোনা সংক্রমণে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়া যাওয়ার আশঙ্কা রহিয়াছে।

প্রবীণ ও বয়স্কদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারটি আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে। শুধু বিশেষায়িত চিকিত্সাকেন্দ্রই নহে, জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে হইলে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে মেডিক্যাল কলেজগুলিতে আলাদা পড়াশুনা ও এই বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তৈরি করাও জরুরি। সরকারি-বেসরকারি যেই সকল হাসপাতাল রহিয়াছে সেইখানে এই সংক্রান্ত প্রশিক্ষিত চিকিত্সক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফ নিয়োগ দেওয়া দরকার। বিশেষ করিয়া ঢাকার বড় হাসপাতালগুলিতে জেরিয়াট্রিক ইউনিট চালু করা জরুরি। আলাদাভাবে জেরিয়াট্রিক ইনস্টিটিউট বা হাসপাতালও নির্মাণ করা যাইতে পারে। এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি।