রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের এক শ্রেণির নিম্নপদস্থ কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রায়শই ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল মালেক অথবা নিম্নপদস্থ কর্মচারী আবজালের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। শুধু এই দুই জনই নন, এমন আরো অনেকেই আছেন যারা আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। অবস্থা দেখে যে কারো মনে হতে পারে এ কর্মচারীরা কতই না ক্ষমতার অধিকারী। ক্ষমতাবান না হলে এরা কীভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে এত বিত্ত-বৈভব গড়ে তুললেন? সম্প্রতি এক জন কলাম লেখক একটি জাতীয় দৈনিকে তার কলামে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সততা এবং তার বংশীয় ঐতিহ্য বিবেচনায় রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। তার বক্তব্য পাঠ করলে যে কারো মনে হতে পারে নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা সত্ এবং দায়িত্বশীল হলেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করছি। একটি প্রতিষ্ঠানকে সত্ভাবে পরিচালনার জন্য কর্মকর্তা এবং কর্মচারী উভয়েরই সত্ এবং কঠোর হওয়া প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বেশি সততা প্রয়োজন শীর্ষ কর্মকর্তা বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের। কথায় বলে, পানি এবং দুর্নীতি উভয়ই নিচের দিকে ধাবিত হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চার ধরনের কর্মকর্তা লক্ষ্য করা যায়। এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা অত্যন্ত ট্যালেন্ট। কিন্তু ঘুষ ছাড়া কিছুই বুঝেন না। তারা মনে করেন, ‘চাকরি করি বেতন পাই, কাজ করি ঘুষ খাই।’ দ্বিতীয় এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা কাজ করেন না, ঘুষও খান না। তৃতীয় এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা নিজেরা ঘুষ গ্রহণ করেন না। কিন্তু কেউ ঘুষ গ্রহণ করলে তা না দেখার ভান করে থাকেন। শেষোক্ত এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা নিজেরা ঘুষ গ্রহণ করেন না। কাউকে ঘুষ গ্রহণ করতেও দেন না। এরাই সবচেয়ে বিপদের মধ্যে থাকেন। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা যদি অসত্ হন তাহলে এদের দুর্ভোগের কোনো সীমা থাকে না।
একজন সত্ এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অসত্ কর্মকর্তার অধীনে থাকলে কীভাবে লাঞ্ছিত হন এবং নিজে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করলে কীভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করেন তার একটি বাস্তব উদাহরণ উল্লেখ করব। মনে করি, কর্মকর্তাটির নাম আব্দুল হামিদ। তিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা। প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাকে প্রতিনিয়তই অসত্ কর্মকর্তাদের দ্বারা নানাভাবে লাঞ্ছিত এবং নিগৃহীত হতে হয়েছে। যেহেতু তিনি বসদের ইচ্ছেমতো নোট লিখতে রাজি হতেন না তাই তাকে কেউই তেমন একটা পছন্দ করত না। তাকে ভালো কোনো বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হতো না। একবার পদোন্নতির সময় সিলেকশন বোর্ড কর্তৃক পদোন্নতির জন্য নির্বাচিত হন। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকা পরিচালনা বোর্ডে উপস্থাপন করা হলে সেখানে বর্ণিত কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের নাম কেটে দেওয়া হয়। ফলে আট জন জুনিয়র কর্মকর্তা তাকে ডিঙ্গিয়ে পদোন্নতি লাভ করেন। নানাভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আব্দুল হামিদকে বদলি করানোর ব্যবস্থা করেন। নতুন বিভাগে যোগদান করার পর সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করলে মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে তাকে রাজধানীর বাইরে একটি জেলা শহরে ব্রাঞ্চ হেড করে পাঠানো হয়। আব্দুল হামিদ ব্রাঞ্চ হেড হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর ব্রাঞ্চের অসত্ এবং ঘুষখোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেন। সেখানে এক জন গাড়িচালক ছিলেন খুবই ধুরন্ধর প্রকৃতির। নানা কৌশল অবলম্বন করে গাড়িচালকের দুর্নীতি অনেকটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমন কি কোনো কোনো ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে উেকাচ গ্রহণ করার পর তা ফেরত দিতে বাধ্য হন। এই ব্রাঞ্চে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত দালালকে ব্যাংকে প্রবেশ নিষেধ করে দিলেন। ফলে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ব্যাংকে স্বচ্ছতা ফিরে আসে। আব্দুল হামিদ তার তত্পরতা দিয়ে এটা প্রমাণ করেছেন যে, এক জন শীর্ষ কর্মকর্তা সত্, দায়িত্বশীল এবং কঠোর মনোভাবাপন্ন হলে তার পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়।
নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যদি সত্ এবং দায়িত্বশীল হন তাহলে তার অধীন কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের পক্ষে দুর্নীতি করা মোটেও সহজ নয়। স্বাস্থ্য দপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল মালেক তার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অনেককেই চাকরি দিয়েছেন। তিনি কি নিজে নিয়োগপত্র দিয়েছেন? তার কি সেই ক্ষমতা আছে? নিশ্চয়ই তিনি ‘টপ বস’কে ম্যানেজ করেই এটা করেছেন। টপ বসের সঙ্গে সে ধরনের সম্পর্ক না থাকলে তিনি এক জন গাড়িচালকের দ্বারা ম্যানেজ হবেন কেন? নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার হাতে কিছু ক্ষমতা থাকে যা ব্যবহার করে তিনি অধীনদের ম্যানেজ করতে পারেন। যেমন, বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন (এসিআর)। এসিআর-এর মাধ্যমে এক জন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বার্ষিক কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা হয়। এসিআর এ বিরূপ মন্তব্য থাকলে পদোন্নতিতে ঝামেলা হতে পারে। বার্ষিক বেতন বর্ধন সুবিধা রহিত হতে পারে। এমন কি পদাবনতিও হতে পারে। কাজেই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যদি সত্ এবং দায়িত্বশীল হন তাহলে অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আমরা যারা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করি তারা প্রতিষ্ঠানকে কতটা নিজের বলে মনে করি সেই প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতেই পারে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে। আর একই নেচারের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা অর্জন করছে। এর কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয় প্রতিনিধির মাধ্যমে। সেখানে মালিক থাকেন অনুপস্থিত। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় মালিকের অধীনে। কাজেই ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা থাকে বেশি। আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা থাকে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিষয়ক কলাম লেখক
