মধ্যরাতে শয়নকক্ষে হানা দিয়ে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানকে নৃসংশভাবে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার মধ্যরাতে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলায়। গভীর রাতের কোনো এক সময় ঘাতকরা সবার অগোচরে ঘরে ঢুকে নারকীয় এ তাণ্ডব চালিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহতরা হলেন উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের খলসী গ্রামের শাহজাহানের পুত্র মত্স্য ব্যবসায়ী শাহিনূর রহমান (৪০), শাহিনূরের স্ত্রী সাবিনা খাতুন (৩০), তাদের পুত্র সিয়াম হোসেন (১০) ও কন্যা তাসনিম (৮)। তবে এই দম্পতির পাঁচ মাস বয়সি কন্যাসন্তান মারিয়া তার বাবা-মায়ের সঙ্গে একই ঘরে থেকেও পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে। খুনিরা তাকে আঘাত করেনি বলে জানা গেছে।
নিহত শাহিনুরের ছোট ভাই রায়হানুল ইসলাম জানান, বাড়িটিতে তার মা ও বড় ভাইয়ের পরিবারের চার জনসহ তারা সাত জন থাকেন। তাদের মা গতকাল এক আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন। ঘটনার সময় রায়হানুল নিজে ছিলেন পাশের ঘরে। বৃহস্পতিবার ভোরে ভাইয়ের ঘর থেকে তিনি গোঙানির শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পান, ঘরের বাইরে থেকে দরজা আটকানো। দরজা খুলে দেখতে পান সেই রক্তাক্ত বীভত্স দৃশ্য। তখনো গুরুতর আহত অবস্থায় একটা শিশু বেঁচে ছিল। তবে কিছুক্ষণ পর সে মারা যায়।
তিনি আরো জানান, তাদের সঙ্গে জমিজায়গা নিয়ে পাশের কিছু লোকের বিরোধ চলছিল। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কি না, কিংবা অন্য কোনো কারণে কেউ এ ঘটনা ঘটিয়েছে কি না, তা এখনই বুঝতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
সরজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, একতলা বাড়িটি গ্রিল দিয়ে ঘেরা। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতকরা রাতের যে কোনো সময় ছাদে উঠে সিঁড়িঘর দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শাহিনুর গলাকাটা অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়েছিলেন খাটের ওপর। নিচে একইভাবে স্ত্রী সাবিনা খাতুনের লাশ পড়েছিল। পাশের ঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় ছিল মেয়ে ও ছেলেটির গলাকাটা লাশ।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে কলারোয়া থানার পুলিশ তাত্ক্ষণিক ঘটনাস্থল হাজির হয়। খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাহিদ আহমেদ, সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফুির রহমান, অতিরিক্তি পুলিশ সুপার মির্জা সালাহ উদ্দীন এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া র্যাব, ডিবি ও সিআইডির টিমও ঘটনার প্রাথমিক আলামত সংগ্রহসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্ত করছে। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর টিমও সেখানে অধিকতর তদন্তের জন্য যোগ দেয়।
পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে গৃহকর্তা, তার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে সব আলামত সংরক্ষণ করছি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত অস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কারা, কী কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। তদন্তসাপেক্ষে পরবর্তীকালে বিস্তারিত বলা যাবে। তবে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি হারাণ চন্দ পাল বলেন, নিহত শাহিনূরের পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে। চিলেকোঠার (সিঁড়ির ঘর) দরজা খোলা ছিল। সম্ভবত খুনিরা সেখান দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে শাহিনুরের শাশুড়ি বাদী হয়ে কলারোয়া থানায় অজ্ঞাত ৮/১০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
শিশুটির দায়িত্ব নিলেন ডিসি : ভাগ্যক্রমে খুনিদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া পাঁচ মাসের শিশু মারিয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) এস এম মোস্তফা কামাল। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে এই আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। শিশুটি অতি ছোট হওয়ায় আপাতত তার দেখভালের জন্য স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য (মেম্বার) নাসিমা খাতুনের কাছে বুঝিয়ে দেন ডিসি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্মম ও নিষ্ঠুর হত্যার শিকার হয়েছেন এক পরিবারের চার জন। তবে খুনিরা ছোট্ট শিশুটিকে হত্যা করেনি। তার আপনজন বলতে আর কেউ নেই। তাই শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছি আমি। শিশুটির পরিবারের কোনো স্বজন তার অভিভাবকত্ব দাবি করলে আইনগতভাবে সমাধান করা হবে। সে এখন থেকে আমার তত্ত্বাবধানে থাকবে।
