দেশের রাজনীতিতে দৃশ্যত কোনো চাঞ্চল্য নেই। করোনা ভাইরাস জনজীবনে যেমন নানা দুঃখকষ্টের অভিঘাত এনেছে, তেমনি রাজনীতিকেও ঘরবন্দি করেছে। রাজনীতির মাঠ শিগিগরই গরম হয়ে ওঠার কোনো বাস্তবতা দেশে আছে বলে মনে হয় না। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে। আবার এটাও ঠিক যে, বিরোধী রাজনীতিকে অচল করতে পারলেও দেশের বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কেবলই বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবন ধারণ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আয় কমছে। ব্যয় বাড়ছে। হিসাব মিলাতে পারছে না বেশির ভাগ মানুষ।
কেন বাজারে অস্থিরতা তার কোনো যুক্তিসংগত কারণ আছে বলেও মনে হয় না। সবকিছু চলছে একশ্রেণির ব্যবসায়ীর মর্জিমাফিক। তারা তাদের লাভের লোভে পুড়িয়ে মারছে সাধারণ ক্রেতা-ভোক্তাদের। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হলো কয়েক গুণ। তারপর পেঁয়াজ এলেও দাম কমার নাম নেই। মানুষ পাইকার-মহাজন-মজুতদার-মুনাফাখোরদের কাছে অসহায়, জিম্মি। রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রণ যেহেতু ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে, তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। হঠাত্ করে আলুর দাম কেন বাড়ল? পর্যাপ্ত আলু মজুত আছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি নেই। তাহলে? আলু কারবারিদের মনে হয়েছে, দাম বাড়িয়ে মুনাফা লোটার। ব্যস। সরকার আলুর কেজিপ্রতি দাম ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও কে শোনে কার কথা! ভোক্তাদের ৫০-৫৫ টাকা কেজি দরেই কিনতে হচ্ছে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, সবজিসহ সবকিছুরই দাম চড়া। কম শুধু মানুষের আয়-রোজগার। করোনাকালেও কিছু মানুষ অসত্ উপায়ে ধনবান হচ্ছে আর বেশি মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। বৈষম্য বাড়ছে। মানুষের অভাব-অভিযোগ নিয়ে রাজনীতিবিদদের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষকে পাশে পাওয়া, তাদের দুর্দশা লাঘবের চেষ্টা নেই। রাজনীতি যতটুকু আছে সেটা পরস্পর দোষারোপের।
গত শতকের শেষ দশক থেকে মাঝেমধ্যেই ‘বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি’র বিষয়টি সামনে আসে। কিছু তত্পরতাও লক্ষ করা যায়। কিন্তু রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানোর কাজটি আর হয় না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি—এই তিনটি বাংলাদেশে শাসক দল। অর্থাত্ এই তিন দল বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থেকেছে বা আছে। তবে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি একই ধারার, একই রাজনৈতিক আদর্শ-বিশ্বাসের দল। আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারা এবং আদর্শ-বিশ্বাসের দল। আওয়ামী লীগের জন্ম ও বিকাশ এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি সামরিক শাসকদের ঔরসজাত দল। তবে এর মধ্যে জাতীয় পার্টি এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে টিকে আছে। দুই দলেরই পক্ষে-বিপক্ষে মানুষ আছে, সমর্থন ও বিরোধিতা আছে। এই দুই দলের বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার তাগিদ আছে। বছরখানেক আগে ১২টি বামপন্থি দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটি বাম বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু তার আর পর নেই। আহ্বানেই সব শেষ। অবশ্য বাম বিকল্পের কথাও নতুন নয়। বাম শক্তি রাজনীতিতে প্রভাবকের ভূমিকায় যেতে পারবে বলে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা দেশে খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না।
এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে এক যৌথ বিবৃতিতে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি অহিংস বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
ডা. চৌধুরী এবং ড. হোসেনসহ আরো কেউ কেউ একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারা অথবা শক্তি গড়ে তোলার কথা বলছেন অনেক দিন ধরেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ‘আপদ-বিপদ’ উল্লেখ করে এই দুই দলের হাতে বন্দি রাজনীতিকে মুক্ত করার কথা কেউ বললে সেটা খারাপ লাগে না। খারাপকে হটিয়ে ভালো আসলে কার না ভালো লাগবে ! কিন্তু মুসিবত হলো, মানুষ কম খারাপ থেকে বেশি খারাপ অথবা বেশি খারাপ থেকে কম খারাপের বৃত্তের বাইরে যেতে পারছে না। তাই বিকল্প নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বা উত্সাহ কোনোটাই লক্ষ করা যায় না। সেজন্য নিন্দা-মন্দ যা-ই করা হোক না কেন মানুষ আ.লীগ-বিএনপি ছাড়ছে না। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কামাল হোসেন—দুজনই প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় মানুষ। কিন্তু তাদের নেতৃত্বে দেশে বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামে ভাঙনের সানাই বাজছে। কয়েকজন লোক, তা-ও একমতে, একপথে চলতে পারেন না। এরা গড়ে তুলবেন বৃহত্তর ঐক্য?
তারা আহত বোধ করতে পারেন, ক্ষুণ্ন হতে পারেন কিন্তু সত্য এটাই যে সাধারণ মানুষ তাদের আস্থায় নিতে পারেনি বা পারছে না। তারা নিজেরাই তাদের ‘পোটেশিয়াল’ নষ্ট করেছেন। মানুষের কাছে যাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে—এমন আশা করার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া যারা বিকল্প রাজনৈতিক ধারার কথা বলেন, সাধারণ মানুষ তাদের বিদ্যমান ধারার কোনো-না-কোনো অংশের প্রতিনিধি বলেই মনে করে। তারা ‘আলাদা’ এটা এতদিনেও তারা প্রমাণ করতে পারেননি। তারা কয়েকটি ছোট দল মিলে একটি জোট হয়তো গঠন করতে পারেন কিন্তু আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির আনুকূল্য না পেলে তাদের কারো পক্ষে ভোটে জিতে আসা সম্ভব বলে মনে হয় না। ভোটারদের ‘মাইন্ডসেট’ না বদলালে এবং বড় দুই দলের পক্ষপুটে থেকে বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে উঠবে কীভাবে?
দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে ইদানীং অতি আশাবাদী কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্তে আসেন যে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলেরই মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করার আশঙ্কা আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সে রকম মনে করি না। মুসলিম লীগের পরিণতি বলতে নিশ্চয়ই জনসমর্থনহীনতা বা দুর্বল অবস্থানের কথাই বলা হয়। এই দুই দলের অবস্থান দুর্বল তখনই হবে যখন তাদের চেয়ে উন্নত বা ভালো রাজনীতি নিয়ে আরো কোনো দলের আবির্ভাব ঘটবে। রাজনীতিতে শূন্যতা থাকে না। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি দুর্বল হলে সবল হবে কে? সেরকম কোনো দল সামনে না দেখা পর্যন্ত মানুষ এ-দল বি-দলই করতে থাকবে। এখন যেমন বিএনপি দুর্বল হলে আওয়ামী লীগ সবল হয়, আবার আওয়ামী লীগ দুর্বল হলে সবল হয় বিএনপি।
অনেকে আক্ষেপ করে বলেন যে, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এক নয়। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ছিল গণতান্ত্রিক, উদার ও প্রগতিমুখীন। আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সব মিলিয়ে কিছুটা যেন পশ্চাদ্গামী। বিশেষ করে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে আওয়ামী লীগ এখন পিছু হঠার নীতি নেওয়ায় অনেকেই উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আর বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এক থাকার বাস্তব পরিস্থিতি কি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিরাজ করছে?
ভালোর সঙ্গে যখন প্রতিযোগিতা হয়, তখন ভালো হওয়ার প্রবণতাই বাড়ে। এখন আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে হচ্ছে বিএনপির মতো একটা সাম্প্রদায়িক-রক্ষণশীল এবং স্বৈর-মানসিকতার দলের সঙ্গে। বিএনপির মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগকে আপস-সমঝোতার পথে হাঁটতে হচ্ছে। এটা দলটিকে আদর্শিকভাবে দুর্বল করে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে দলের শুভার্থীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে সান্ত্বনা এটাই যে, বিএনপি যদি আলকাতরা হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ হলো পানি। আওয়ামী লীগের রং পরিবর্তন সম্ভব হলেও বিএনপি বদলাবে না। অনুকূল শক্তি সমাবেশ ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে বদলানো গেলেও বিএনপিকে বদলানো যাবে না।
বিএনপি যে হত্যা-খুনের রাজনৈতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না তার প্রমাণ দলের নেতারা এখনো দিয়ে চলেছেন। আমাদের দেশের রাজনীতিতে ১৫ এবং ২১ আগস্ট রক্তক্ষরণের দুটি দিন। বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের জঘন্য পথ অনুসরণের এই দুটি দিনের সঙ্গে বিএনপির নাম জড়িয়ে আছে। বিএনপি যে হত্যা-খুনের রাজনৈতিক ধারার বাইরে এত বছরেও দলটি তা সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের আগস্ট কাণ্ডের সময় বিএনপি নামক দলটির জন্মই হয়নি। তাই ঐ সময়ের ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নাম আসে কীভাবে? একাধিক কারণে সেটা আসে। প্রথমত, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান বেনিফিশিয়ারি। দ্বিতীয়ত, হত্যা-পরবর্তী সময়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে বিএনপি সচেষ্ট ছিল। ঘাতকদের বিএনপি সব সময় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। তৃতীয়ত, ২১ আগস্টের ঘটনার সময় বিএনপি-জামায়াত জোটই ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি ২১ আগস্ট ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে হামলাকারীদের আড়াল করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে শারীরিকভাবে নির্মূলের এই রাজনীতির প্রতি বিএনপির প্রকাশ্য সমর্থন, সহানুভূতি, পৃষ্ঠপোষকতা কোনো গোপন বিষয় নয়। অথচ এজন্য বিএনপির যে নিন্দা-সমালোচনা হওয়া উচিত, বাস্তবে তা নেই। দেশের বিভেদ ও সংঘাতের রাজনীতির জন্য আমরা অনেকেই এক বাক্যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে সমানভাবে দায়ী করে থাকি। কিন্তু একবার ভেবে দেখি না, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে যদি এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে আমরা কী করতাম? আমি জানি যে, একজন আমাকে হত্যার জন্য অস্ত্র তাক করে আছে, দু-একবার ব্যর্থ হামলাও চালিয়েছে—এসব জেনেও ঐ সম্ভাব্য ঘাতক বা ঘাতকদের প্রতি কি আমি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে পারব? আওয়ামী লীগ সরকারে আছে, রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কেন বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসে না—এই প্রশ্ন আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে। কিন্তু আমরা আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে শেখ হাসিনার কষ্টের দিকটা সেভাবে বিবেচনা করি না।
আওয়ামী লীগকে অস্ত্র দিয়ে প্রতিহত করার ধারণা গণতন্ত্রের সঙ্গে একেবারেই যায় না। বিএনপি যদি আস্তিনের নিচে অস্ত্র লুকিয়ে রেখে গণতন্ত্রের জন্য কান্নাকাটি করতে থাকে, তাতে আওয়ামী লীগ ভুলবে কেন? দেশের মানুষকেও দলপ্রীতির ক্ষেত্রে বিচার-বিবেচনাবোধের পরিচয় দিতে হবে। অন্ধত্ব পরিহার করতে হবে। আওয়ামী লীগকে যদি সমর্থনযোগ্য মনে না হয়, তাহলে বিএনপি কোন বিবেচনায় সমর্থনের তালিকায় আসে?
n লেখক :জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
