অজয় রায়ের বাংলাদেশ

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩০

১৭ অক্টোবর রাজনীতিবিদ ও সমাজ চিন্তক অজয় রায়ের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের এই দিন ৮৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি যেমন একটি দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন, তেমনি এই জীবনকে তিনি উত্সর্গ করেছিলেন মানুষের জন্য। শোষণ, বৈষম্য এবং সব ধরনের নিপীড়নমুক্ত একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আমৃত্যু নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। একেবারে স্কুলজীবন থেকেই সমাজতন্ত্রকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরিবেশ কখনো তার কাজের বা স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার অনুকূলে ছিল না। কিন্তু বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করেই তিনি কাজ করেছেন। মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা—তাকে প্রতিকূলতা উপেক্ষা করার শক্তি জুগিয়েছে। তিনি নিজের বা পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির কথা ভাবেননি। ভেবেছেন সব মানুষের কথা। সবার পেটে খাবার জুটবে, মাথার ওপর ছাদ থাকবে, পরনে কাপড় থাকবে, শিক্ষার সুযোগ থাকবে, রোগে উপযুক্ত চিকিত্সার ব্যবস্থা হবে, কাজ থাকবে—এমন একটি দেশের জন্যই তিনি ১৫ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, বছরের পর বছর কাটিয়েছেন আত্মগোপনে।

অজয় রায় ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। বারাণসী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৫ সালে আইএসসি পাশ করেন। বারাণসীতেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং সক্রিয় কমিউনিস্ট হয়ে ওঠেন। অজয় রায় ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি লেখালেখিও করতেন। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ২০টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বাঙলা ও বাঙালি, বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান, বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার সংকট ও সমাধান, বাংলার কৃষক বিদ্রোহ, রাজনীতির অ আ ক খ, আমাদের জাতীয় বিকাশের ধারা, বাংলাদেশের বামপন্থি আন্দোলন ইত্যাদি। ‘তীরের অন্বেষায়’ নামে একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থও তিনি লিখেছেন। বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে তিনি নিয়মিত কলামও লিখতেন।

৮৭তম জন্মদিন উদ্যাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘স্কুলে থাকাকালেই সূচনা হয়েছিল সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারার সঙ্গে পরিচয়। এজন্য পথ চলার কর্তব্য নির্ধারণে সমস্যা হয়নি। গত ছয়-সাত দশকে উত্থান-পতনের মোকাবিলা তো কম করতে হলো না আমাদের।...কোনো কোনো সময় হতাশা যে প্রভাব বিস্তার করতে না চেয়েছে, তা নয়। কিন্তু তার পরও শেষ পর্যন্ত হতাশা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে একদিকে যেমন ইতিহাসের গতিধারার অনিবার্যতার ওপর আস্থার কারণে, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সেই অমর ঘোষণা—মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ—তার ওপর আস্থা রাখতে পারায়। বলতে দ্বিধা নেই, এই বিশ্বাসই যেমন সব সংকটমুহূর্তে রক্ষা করেছে আমাকে, তেমনি আশাবাদী করে তুলেছে ভবিষ্যত্ সম্পর্কে এবং উত্সাহিত করেছে পরিবর্তনের ধারায় প্রবহমানতার সঙ্গে সংগতি রেখে পথচলার ক্রমাগত প্রয়াসে।’ অজয় রায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। লাখো শহিদের আত্মদানে অর্জিত স্বদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ হবে—এটা ছিল অজয় রায়ের বিশ্বাস ও লক্ষ্য, এই লক্ষ্য অর্জনে নিজেও নানামুখী কাজ করেছেন। মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনার জন্য শিক্ষা-সংস্কৃতির বিস্তারে তিনি আগ্রহ নিয়ে কাজ করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে থেকে মানুষকে সংগঠিত ও সচেতন করার কাজে শ্রম ও মেধা ব্যয় করেছেন।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকের একপর্যায়ে মতাদর্শিক ভিন্নতায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নিজেকে বিছিন্ন করলেও মুহূর্তের জন্যও মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করেননি। তিনি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলে সব ধরনের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ করেছেন আমৃত্যু। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা যেখানেই দেখা গেছে সেখানেই তিনি পরিণত বয়সেও ছুটে গেছেন। জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের উত্থানের বিপদ তিনি উপলব্ধি করতেন বলেই তার বিরুদ্ধে লেখালেখি করার পাশাপাশি রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদও সংঘটিত করেছেন। তিনি ছিলেন সদা সক্রিয় মানুষ। প্রায় ৪৭ বছরের সংসারজীবনে অত্যন্ত কাছে থেকে তাকে দেখা ও বোঝার সুযোগ আমার হয়েছিল। মানুষের মঙ্গলচিন্তা ছাড়া তিনি আর কিছুই ভাবতেন না। এজন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তার শেষশয্যা পাতা হয়েছে বনগ্রামের মাটিতে। সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়েছে। এই স্মৃতিসৌধ ডিজাইন ও নির্মাণ করে দিয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত স্থপতি রবিউল হোসাইন। স্মৃতিসৌধ উদ্বোধনের দিন ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নোভা আহমেদ চৌধুরী, সাবেক আইজিপি ও সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ, অজয় রায়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা পংকজ ভট্টাচার্য, শেখর দত্তসহ অনেকের উপস্থিতি তার প্রতি ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। আজ অজয় রায়ের মৃত্যু দিবসের মুহূর্তে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার একের পর এক খবর শুনে বিচলিত বোধ না করে পারছি না। একশ্রেণির মানুষ কেন এমন বেপরোয়া, উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠছে? অজয় রায় তো এমন বাংলাদেশ চাননি। একটি সুন্দর দেশ—সাম্য ও সৌহার্দের দেশই তো তার এবং তার মতো আরো আত্মত্যাগী রাজনীতিমনস্ক মানুষের মনে জাগ্রত ছিল। নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করা, তাদের সামনে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়া আজ জাতীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যদি বাংলাদেশকে নারী-পুরুষ, গরিব-নিঃস্ব, ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপদ বাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তাহলেই অজয় রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।

n লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, সমাজকর্মী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা