ভবদহবাসীর পানিবন্দি দশা

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩২

হোয়াংহো নদীকে এক সময় চীনের দুঃখ বলা হতো। ২৬ বার এই নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার ফলে প্রত্যেকবারই চীনের জনগণের জীবনে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা। আধুনিক চীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চীন সরকার এই নদীরপাড়ের বেড়িবাঁধকে আরো মজবুত করে। ফলে বিংশ শতাব্দীতে হোয়াংহো নদীর তীরবর্তী জনসাধারণের নিরাপত্তা সুরক্ষিত হয়। চীনের জনগণ হোয়াংহোর দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করলেও বাংলাদেশের যশোরের ভবদহ এলাকার জনগণ পানিবন্দি দশা থেকে দীর্ঘ দিনেও মুক্তি পাচ্ছে না। হোয়াংহো নদীর ন্যায় যশোরের ভবদহও যেন এখানকার জনগণের কাছে এক অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের প্রতীক, ভয়াবহ এক জলাবদ্ধতার প্রতীক। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে এখানকার পানিবন্দি মানুষগুলোর জীবন হয়ে পড়ছে দুর্বিষহ আর বিভীষিকাময়। ভবদহে বসতভিটা থেকে শুরু করে চাষের জমি, মাছের ঘের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমন কি ধর্মীয় উপাসনালয় সবকিছুই আজ পানির নিচে। অবস্থা এমন যে, দৃষ্টি যতদূর যায় চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। এক প্রকার বাধ্য হয়েই এখানকার মানুষজন জীবনযাপনে গৃহপালিত পশুর সঙ্গে এক বিছানায় অবস্থান করছেন। আর এমন পরিবেশে বসবাস করতে গিয়ে সাপ আর ব্যাঙ যেন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠেছে। দীর্ঘ সময়ের জলাবদ্ধতার কারণে এ অঞ্চলের জনগণ একদিকে যেমন পঙ্গু হচ্ছেন অর্থনৈতিকভাবে, তেমনি অপরদিকে শিক্ষা লাভের দিক থেকেও পিছিয়ে পড়ছেন। কারণ, বছরের একটা দীর্ঘ সময় তাদেরকে বাধ্য হয়েই বসবাস করতে হয় পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে। এমন অবস্থায় ওখানে কেউ মারা গেলেও তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পর্যন্ত করতে হয় ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে, যা সত্যিকার অর্থেই দুঃখজনক।

বর্তমানে পানিবন্দি এ এলাকার অবস্থা আগের মতোই। অর্থাত্, এ বছরও ঐ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে। ফলে বিভিন্ন রোগব্যাধি এ এলাকার জনগণের জন্য ভাগ্য দেবীর অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা শুরু করেছেন পানিবন্দি জীবন থেকে মুক্তির আন্দোলন। প্রায় প্রতি বছরই আন্দোলন হয়। কিন্তু ফলাফল এখনো শূন্যের কোটায়। সরকারও প্রতি বছর পানিবন্দি এসব মানুষদের জন্য বরাদ্দ দেয় হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সরকারের দেওয়া বরাদ্দের সামান্যটুকুও পান না এখানকার ভুক্তভোগী জনগণ। ফলে পানিবন্দি এলাকার মানুষজন তাদের যৌক্তিক প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত থেকেই যাচ্ছেন। ভবদহের পানিবন্দি এই মানুষগুলো এখন আর সরকারি বরাদ্দ কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লুটার আন্দোলন নিয়ে চিন্তিত নন। তারা এখন রাতে ঘুমাতে চান ঘরের চালের নিচে, খোলা আকাশের নিচে নয়। তারা আর কখনোই সাপ-ব্যাঙকে সঙ্গী করে রাত্রিযাপন করতে চান না। সরকারের কাছে তাদের এখন একটাই দাবি আর তা হচ্ছে—জলাবদ্ধ ভবদহবাসী ত্রাণ নয়, পানিবন্দি দশা থেকে চিরতরে মুক্তি বা পরিত্রাণ চাই। বর্তমান সরকারের কাছে ভবদহবাসীর প্রাণের দাবি হচ্ছে টিআরএম বা টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারধার বাস্তবায়ন করা। সেই সঙ্গে নদীখনন করা এবং সরকারিভাবে ভবদহকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিতভাবে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধায়ন করা, যেন ভবদহবাসী চিরতরে এই বন্দি দশা থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে। এ দাবির পেছনে তাদের বেশ শক্তিশালী যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে।

জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে ভবদহবাসী নিজেদের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে ভায়নার বিলে টিআরএম কার্যকর করে আর পরবর্তীকালে এ থেকে তারা সুফলও পায়। যার ফলশ্রুতিতে সরকার এই ব্যবস্থাকে সরকারিভাবে গ্রহণ করে ২০০৭ সালে বিলা খুকশিয়ায় আবার টিআরএম চালু করে এবং পরবর্তী কয়েক বছর জলাবদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি মিলে। বর্তমানে ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে এলাকার কোনো বিলে টিআরএম কার্যকর নেই। ফলে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে এ অঞ্চলের প্রত্যক্ষভাবে ২৭টি এবং পরোক্ষভাবে ২৫টি মোট ৫২টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ভবদহের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম পথ মুক্তেশ্বরী টেকা শ্রী হরি নদীর তলদেশ নাব্যতা হারিয়েছে এই একই কারণে। জলাবদ্ধ এলাকার অল্প কিছু পানি নিষ্কাশন হয় আমডাঙ্গা খাল দিয়ে যা আজ অবহেলার কারণে কোনো উপকারে আসছে না। এখন আশেপাশের কোনো বিলে টিআরএমের মাধ্যমে নদীর পলি অবক্ষেপণ করলে বিলগুলো যেমন উঁচু হবে, তেমনি নদীগুলোও সচল হওয়ার পাশাপাশি ফিরে পাবে তাদের পূর্ণরূপ। সমুদ্র থেকে আসা জোয়ারের পানি দিনে দুইবার এই নদীগুলো দিয়ে এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। আবার ভাটির সময় পানি সাগরে ফিরে যায়। কিন্তু রেখে যায় জোয়ারে নিয়ে আসা পলি। এভাবেই পলি পড়ে নদীগুলো নাব্যতা হারাচ্ছে। আর ধারাবাহিকভাবে এ অবস্থা চলতে থাকায় জলাবদ্ধ এলাকা থেকে দ্রুত নিস্তার মিলছে না ভবদহবাসীর। টিআরএম বা জোয়ারধার পদ্ধতিকে এই সমস্যার সমাধান হিসেবে সরকারিভাবে আবারও বেছে নেওয়া উচিত বলে মতামত দিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এই টিআরএম ভবদহবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। স্থানীয়ভাবে যারা এ বিষয় নিয়ে আন্দোলন করছেন তাদেরও প্রাণের দাবি এই টিআরএম সুতরাং, যত দ্রুত এই পদ্ধতি কার্যকর করা যাবে, তত দ্রুতই পানিবন্দি এ দশা থেকে মুক্তি মিলবে।

n লেখক :আয়কর আইনজীবী, সদস্য,

ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশন