করোনাভাইরাস অভিশাপ হয়ে এলেও পরস্ফুিটিত করেছে ইতিবাচক কিছু দিক। নগর ঢাকার জঞ্জাল অনেক; ধুলোবালিতে ফ্যাকাসে হয়ে থাকে গাছের পাতা। গাছের মোলায়েম সবুজাভ পাতার প্রকৃত চেহারা চোখে পড়ে না। লকডাউনের সময় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে লাগানো গাছে দেখা গেছে ফুল। ঢাকা যেন হেসে উঠেছিল ‘বন্দি’ অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে। সেই ‘পরিশীলিত ঢাকা’ ফের ঢাকা পড়তে শুরু করেছে। ফিরেছে তাবত্ সমস্যা ও গঞ্জনারাশি।
প্রতি বছর দুটো ঈদেই ঢাকার চিত্র থাকে প্রায় অভিন্ন। সংবাদপত্রগুলো কাব্যিক শিরোনাম করে—ঢাকা এখন ফাঁকা! কিন্তু ‘ফাঁকা’ চিত্রটি বড়জোর এক সপ্তাহের। তারপর আবার সব আগের মতোই। সেই দুঃসহ যানজট, হরেক রকম বিশৃঙ্খলা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা। এ চালচিত্র সয়েও গেছে অনেকের। কিন্তু এটা কি জীবন, এটাই হবে শহুরে বাসিন্দাদের ললাটলিপি!
ঢাকার রাস্তা ফাঁকা, যানজটহীন যান চলাচল দেখাটা স্বপ্নের মতো। কিন্তু এই স্বপ্নটাই ঈদের দুই দিন আগে এবং দুই দিন পরে বাস্তবায়িত হয়। চলতি বছরের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় দেখা গেছে এমন ‘মোহন’ দৃশ্য। ফাঁকা ঢাকার সৌন্দর্য অতুলনীয়। সীমিত পরিসরে যানবাহন চালুর শুরুর দিকটাতে শাহবাগ থেকে পল্টন যে কোনো বাস চলে যেতে পেরেছে তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে। স্বাভাবিক (!) সময়ে যা মোটামুটির এক ঘণ্টার ধাক্কা। পৃথিবী যখন রকেট গতিতে এগুচ্ছে, আমরা তখন অনূর্ধ্ব দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে এক ঘণ্টা বসে থাকছি গাড়িতে। অথচ সামান্য পথটুকু ইচ্ছা করলে হেঁটেও যাওয়া যায়। হেঁটে গেলে সময় লাগবে বড়জোর ১৫ মিনিট। কিন্তু নাগরিক শরীর হাঁটতে জানে না, নাগরিক মন গণ্ডিবদ্ধ সীমানা ছেড়ে সরতে পারে না।
যানজটের বড় একটি কারণ প্রাইভেট কারের আধিক্য। গাড়ি বাড়ছে কিন্তু রাস্তা তো সেই আগের মতোই। বরং মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের কারণে পরিসর কমেছে রাস্তার। গাড়ির সঙ্গে রাস্তা বাড়ছে না বলেই সমস্যা প্রকট হচ্ছে। খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, বিমানবন্দর রোডসহ আরো ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। এতে কিছুটা হলেও ফিরেছে স্বস্তি। আবার অনেক সময় ফ্লাইওভারের ওপরেই যখন যানজট সৃষ্টি হয়, স্থির সারি সারি গাড়ি দেখা যায়—সে দৃশ্যও একধরনের বেদনা বয়ে আনে! যানজট কমানোর জন্য যে ফ্লাইওভার সেখানেই যদি একই সমস্যা দেখা দেয় তাহলে কাকে কী বলার থাকে। এ পন্থায় সামষ্টিক যানজটের কোনো সুরাহা হবে কি না সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ফলে সব ভাবনা-দুর্ভাবনার পরও দিন-দিন বেড়েই চলে সমস্যা। নাগরিকজীবন বিপর্যস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত দৈনন্দিন কর্মতত্পরতা। এরকম আরো হবে, ভবিষ্যতে আরো তীব্র আকার ধারণ করবে এতে সন্দেহ নেই। যদি না এখনই কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা না হয়। গণপরিবহনগুলো চলাচলে গতি ও স্বচ্ছতা আনলে অনেকেই যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। চাপ কমানো যাবে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর।
কিছু কিছু অনিবার্য প্রয়োজনে মফস্সল বা ঢাকার বাইরের মানুষকে ঢাকা আসতেই হয়। গুরুত্বপূর্ণ সব অফিস-আদালত ঢাকাতেই। অতীতে অনেকবার আলোচনা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলো বাইরের জেলায় স্থানান্তরের। যদি তা করা যায়, ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কমবে। যার যার এলাকায় বা এলাকার কাছেই যদি প্রয়োজনীয় কাজ সারা যায়, তাহলে কষ্ট করে মানুষ ঢাকা আসবে কেন!
প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার ঢাকা কবে নাগাদ ‘ঢাকা’ অবস্থা থেকে মুক্ত হবে, আদৌ এ নগরীর ললাটে মুক্তি আছে কি না—সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে সময় থাকতেই আমরা সতর্ক হতে পারি। বেশি কিছু নয়, অল্প কয়েকটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই ঢাকা পেতে পারে ‘বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর একটি’ অপবাদ থেকে মুক্তির সিঁড়ি-পথ।
ঢাকা
