আকবর ভয়ংকর!

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ২২:৪৪

সিলেটের কোতয়ালি থানার বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে যুবক রায়হানকে হত্যা ঘটনার মূল নায়ক এসআই আকবর হোসেন এখন কোথায়? এই প্রশ্ন এখন জেলার ঘরে ঘরে। সিলেটবাসী বলছেন, রায়হান হত্যার ছয় দিন অতিবাহিত হলেও আকবরকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না? এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। কেউ বলছেন আকবর ভারতে পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ বলছেন তাকে কর্মকর্তারাই লুকিয়ে রেখেছেন। পুলিশ বলেছে, আকবরের খোঁজে আশুগঞ্জের বেড়তলা গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালানো হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এসএমপির কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেছেন, আকবর যাতে পালাতে না পারে সে জন্য সব কটি ইমিগ্রেশনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অবহিত করা হয়েছে।

সুদর্শন চেহারার আড়ালে এসআই আকবর যে ঐ ফাঁড়ির একজন ভয়ংকর পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন —তার মুখোশ এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। কঠিন হূদয়ের আকবর টাকার জন্য সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে পেটাতেন। তার অবৈধ টাকার পাহাড় গড়াসহ নানা অপকর্মের কাহিনী এখন মুখে মুখে। বন্দর বাজার এলাকার ভাসমান হকারসহ নানা শ্রেণির মানুষের বিশাল অঙ্কের টাকা প্রতিমাসে তার পকেটে যেত। সেই টাকায় তার নায়কোচিত চলাফেরা, আশুগঞ্জে গ্রামের বাড়ির অট্টালিকার ছবি এখন মিডিয়ায় ভাসছে।

জানা গেছে, গত রবিবার এসআই আকবরকে  বরখাস্ত ও অন্যদের প্রত্যাহার করার পর অনেকেই পুলিশ লাইনসে থাকলেও ঘটনার মূলহোতা আকবর লাপাত্তা। মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রায়হানের মৃত্যুর ঘটনার পর পরই গা-ঢাকা দেয় আকবর। তার আগে সে খুনের সব আলামত নষ্ট করে দিতে বন্দর ফাঁড়ির সিসিটিভির ফুটেজও মুছে দেয়। এ কারণে ‘ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে’ রায়হান নিহত —এই কথা পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু পাশের এসপি অফিসের সিসিটিভির ফুটেজে ঘটনা ধরা পড়লে আকবরের সহযোগী এক পুলিশ সদস্য ঘটনা স্বীকার করেন।

ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ৩টার পর সিএনজি অটোরিকশা যোগে হাতকড়া পরিয়ে যুবক রায়হানকে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসা হয়। তখন তিনি সিএনজি থেকে নেমে নিজেই হেঁটে পুলিশের সঙ্গে ফাঁড়িতে ঢুকেন। ভোর সাড়ে ৬টার দিকে যখন রায়হানকে ফাঁড়ি থেকে বের করা হয় তখন তার দুই হাত ছিল দুই কনস্টেবলের কাঁধে। পা টেনে টেনে সিএনজি অটোরিকশাতে তোলা হয় রায়হানকে।

গত শনিবার রাতে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় রায়হানকে। এই ঘটনায় ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে এ বিষয়ে মামলা হলে মহানগর পুলিশ পিবিআইয়ের কাছে মামলা হস্তান্তর করে। পিবিআই ফাঁড়ি পরিদর্শন করে নিহত রায়হানের মৃতদেহ আরেক দফা ময়নাতদন্ত করিয়েছে। এরই মধ্যে আকবর সম্পর্কিত অনেক তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। আকবর ঘটনার পরদিন দুপুর পর্যন্ত সাদা পোশাকে ফাঁড়িতেই ছিলেন। ঐ সময়ের মধ্যে তিনি ফাঁড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার  ফুটেজ নষ্ট করে ফেলেন। এমনকি হার্ডডিস্ক সরিয়ে নতুন হার্ডডিস্ক বসানো হয়। এরই মধ্যে তদন্ত কমিটির কাছে অন্য পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, আকবরের নেতৃত্বেই ধরে এনে রায়হানকে নির্যাতন করা হয়। সে সময় আকবর সেখানে ছিলেন।

বিক্ষোভে উত্তাল সিলেট

এদিকে গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা ‘পুলিশী নির্যাতনে’  রায়হান হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে নগরী। কোর্ট পয়েন্টে উলামা পরিষদ, উলামা মাশায়েখ পরিষদ ও ইসলামি ঐক্যজোট এবং সমমনা দলগুলো প্রতিবাদ মিছিল ও মানববন্ধন করে। সমাবেশে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধূরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলসহ বিশিষ্টজনরা বক্তব্য রাখেন। এ সময় বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির গেটে পুলিশের বিশেষায়িত দল সিআরটি টিমকে প্রস্তুত রাখা হয়। 

রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘টাকার জন্য একজন মানুষকে মেরে ফেলা, এটা মানা যায় না। তিনি বলেন, শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সিলেটবাসী রায়হানের পরিবারের সঙ্গেই থাকবে।’