মো. হাবিবুর রহমান মুন্না
আধুনিক সমাজ মানে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে থাকা নয় বরং একটি কাঠামোবদ্ধ জনসমষ্টিতে পারস্পরিক সৌহার্দ, সহযোগিতা ও মমত্বের রেখায় দিনাতিপাত করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ হতে জানা যায়, বিশ্ব জুড়ে ২৭ কোটি মানুষ অনাহারের শঙ্কায় রয়েছে। বিশ্বের অসংখ্য দেশ এখনো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। গ্লোবাল ফিন্যান্সের একটি গবেষণাপত্র হতে জানা যায়, দরিদ্রতার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশটি হচ্ছে বুরুন্ডি আর একই সিরিয়ালে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৯তম (জুলাই, ২০২০)। খাদ্য দিবসে বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলো—দুর্যোগকালীন সময়েও বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বরং কিছু খাদ্য উদ্ধৃত আছে, সেগুলো মজুত করা হয়েছে। আবার প্রবৃদ্ধির শীর্ষ তিনেও বাংলাদেশের অবস্থান। আইএফএমের সূত্রানুসারে, ২০১৯ এ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি (+) ৩ দশমিক ৮ শতাংশ যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি (-) ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় উঠে আসছে, করোনায় দেশে দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের জীবিকায় আঘাত হেনেছে। করোনার পূর্বে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৯ শতাংশ, পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবমতে, পরবর্তীকালে দারিদ্র্যতার হার বেড়ে ২৯ শতাংশে পৌঁছায়। শুধু করোনাকালীন সময়েই দরিদ্রতা ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ২০ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, করোনার পূর্বে পারিবারিক প্রতি মাসে গড় আয় ছিল প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার টাকা যা করোনা পরবর্তীকালে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টাকায় হ্রাস পায়। শুধু তাই নয়, বেকারত্বও বৃদ্ধি পায় ১০ গুণ। দারিদ্র্যতার কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না। দরিদ্রতা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা, সঠিক জ্ঞানের আলো, সুস্বাস্থ্য এবং সুরক্ষিত বাসস্থান। এই চারটি সূচকের প্রত্যেকটির ঘাটতি রয়েছে আমাদের দেশে। এর পেছনে মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ‘দারিদ্র্য চক্র’। পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে দুর্বল স্বাস্থ্য নিয়ে একজন মানুষের কাজে অমনোযোগিতা কিংবা কাজ করতে অক্ষম হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে আয়হীন বা স্বল্প আয়ের জীবনে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও মূলধনের সংকট লেগেই থাকে। এ কারণে জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হয়। উন্নত চিকিত্সা, শিক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ায় এরা দারিদ্র্যের কক্ষপথ হতে বেরোতে পারে না। ফলে দেশে দারিদ্র্যের চাক্রিক সমাবর্তন চরকি কাটতে থাকে।
আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির লক্ষ্যে সরকার গ্রামীণ পর্যায়ে হতদরিদ্রদের মধ্যে ভাতা ও বিনা মূল্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। যার ফলে ২০০১ সালের পর দারিদ্র্যের হার ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে নেমে ২০২০ সালে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ চলে আসে। একটি ক্রমবর্ধিত প্রবৃদ্ধির উন্নয়নশীল দেশের জন্য দরিদ্রতা হ্রাসের এই হার বেশ অপ্রতুল। গত দুই দশকে ক্ষীণ দরিদ্রতা হ্রাসের কারণ হিসেবে বেশ কিছু কারণ আলোচনা করা যায়। তন্মধ্যে একটি, প্রকৃত দরিদ্র ভাতা না পাওয়া, ভাতা কিংবা ত্রাণের পরিমাণে অপর্যাপ্ততা এবং খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে ক্ষমতাশীলদের প্রাদুর্ভাব ও পৃষ্ঠপোষকদের অংশীদারিত্ব। একজন হতদরিদ্র এবং দরিদ্র মানুষের সমপরিমাণ ত্রাণ ও ভাতা প্রাপ্তি কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
দরিদ্রতার চপেটাঘাত মানুষকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তাই যুগে যুগে দারিদ্র্য নিয়ে আবেগে মুড়ানো শব্দে রচিত হয়েছে অসংখ্য গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। দারিদ্র্যের বীভত্স চিত্র এতটাই নির্মম যে, এর গায়ে কার্বনকালি লাগাতে নজরুল, শরত, রবি ঠাকুর, মানিক, বঙ্কিম কেউ-ই বাদ যাননি। এর ভয়ানক দৃশ্যপট হতে প্রতীকগুলো সরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্ব দারিদ্র্য নিরসন দিবস পালিত হয়। ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত বিশ্ব গড়তে মানুষের অসমতা দূর করে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানো এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। আয় বৈষম্য নিরসন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, সামাজিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, প্রতিটি পেশাকে সম্মান প্রদর্শন, কর্মসংস্থানের প্রতিকূলজাত দূরীকরণ, আত্ম মূল্যায়ন, স্বল্পসুদে ক্ষুদ্রঋণ প্রয়োগ, অর্থকরী বিনিয়োগে উদ্দীপনা জাগানো, সম্পদের সমবণ্টন, আইনে ভীতি ও সম্মান প্রদর্শন, মূল্যবোধ বজায় রাখা এবং বিদ্যমান সম্পদ হতে টেকসই সরকারি বিনিয়োগই পারে দারিদ্র্যের বিষাক্ত ছোবল হতে জাতিকে মুক্তি দিতে। আমাদের অর্থনীতি বাহ্যিকিকরণ দুর্গম হলেও অনিশ্চিত নয়। বাহ্যিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং উত্পাদন চাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনে দারিদ্র্যের আঘাত অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব।
লেখক :শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
