সামাজিক সচেতনতা ও বাস্তবতা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ২১:০৩

শৈশবকাল হইতে আমরা পরীক্ষার খাতায় লিখিয়া আসিয়াছি, ‘উক্ত সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা’; কিন্তু সেই সচেতনতা যে কী বস্তু তাহা কখনো খোলাসা করিয়া বলা হয় না বলিলেই চলে। সামাজিক সচেতনতা বলিতে আমরা বুঝিতে পারি বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের সমস্যার প্রতি সমাজের মানুষের কর্মসূচি, সমাজের নানাবিধ সমস্যা যাহা সমাজের শান্তি বিনষ্ট করিবার জন্য দায়ী তাহার বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং সর্বোপরি নিজের ও সমাজের মানুষের অধিকার-কর্তব্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা। তবে সামাজিক সচেতনতা তৈরি হইবার পিছনে কিছু নিয়ামক বিশেষ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান, পারিপার্শ্বিক ভাবনাচিন্তা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন মানিয়া চলিবার প্রবণতা ইত্যাদি সামাজিক সচেতনতার মূল প্রভাবক হিসাবে সর্বজন স্বীকৃত। তবে উদ্বেগের বিষয় হইল, আমাদের দেশের যে কোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞগণ বাস্তবতাকে বিচার-বিবেচনা না করিয়াই ঢালাওভাবে ‘সামাজিক সচেতনতা’ বাড়ানোর ব্যাপারে তাগিদ দিয়া থাকেন।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির এই সংকটকালে আমরা শুনিতে পাই সর্বক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিবার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কথা; কিন্তু বাস্তবতা হইল, দেশের একটি বড়সংখ্যক মানুষ যাহারা গ্রামে কিংবা মফস্সলে বসবাস করিয়া থাকেন তাহাদের মধ্যে সচেতনতার প্রবণতা নাই বলিলেই চলে। কারণ সামাজিক সচেতনতা গড়িয়া উঠে আত্মসচেতনতার মাধ্যমে। নিজের ভালোমন্দ বিবেচনায় মানুষ যখন সচেষ্ট হয় তখনই সে সামাজিক নানাবিধ সমস্যার ব্যাপারে সচেতন হইবার অনুপ্রেরণা পায়।

সামাজিক সচেতনতা যে কেবল সামাজিক সমস্যা সমাধানে উদ্বুদ্ধ করিয়া থাকে তাহা নহে, বরং ইহার সহিত জড়িত দেশের সকল সমস্যা ও সংকটের ব্যাপারে গণমানুষের সচেতনতা। দেশের সংকটকালে মানুষ যদি সচেতন ও প্রতিবাদী না হয়, তাহা হইলে দেশের মঙ্গল সাধন সম্ভব হয় না। সাম্প্রতিককালে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন হইতে দেখা গিয়াছে। তাহারা প্রতিবাদী হইয়াছে, রাজপথে নামিয়া আসিয়াছে। দারিদ্র্যপীড়িত ও উন্নয়নশীল আফ্রিকার দেশসমূহে যেখানে দুর্নীতির শিকড় গভীরে গ্রথিত, সেখানে সাধারণ মানুষের এই সচেতনতা আমাদের নতুন করিয়া ভাবায়। আমরা বুঝিতে পারি মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়া গেলে তাহারা আত্মসচেতনতার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও সচেতন হইয়া উঠে। সাম্প্রতিককালে ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহেও মানুষ অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন ও সোচ্চার হইয়াছে। অবশ্য দুর্নীতি যে পৃথিবীর কোন দেশে নাই, তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। তবে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহে দুর্নীতি অধিক। বিভিন্ন সরকারের আমলে নীতিগত পার্থক্য ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এই সকল দেশে দুর্নীতির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটিয়া থাকে।

অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার এই যে, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার মানুষের অধিকার ও সামাজিক সচেতনতা দেখিয়া যেখানে শিক্ষা গ্রহণ করিবার কথা, সেইখানে অন্য অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষ সচেতন হইতেছে না। আমরা সভা, সেমিনার, আলোচনা, বক্তৃতায় কেতাবি ভাষায় ‘সামাজিক সচেতনতা’ বাড়াইতে বলিয়াই কাজ সারি; কিন্তু সেই সচেতনতা কীভাবে আসিবে, কীভাবে মানুষ নিজের ও সমাজের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে আরো সচতন হইবে, নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাইবে তাহা বলিতে ভুলিয়া যাই। শুধু সচেতনতা বাড়াইতে বলিলেই রাতারাতি সচেতনতা তৈরি হইবে না বরং সমস্যার গভীরে যাইয়া সমাধানের পথ বাতলাইয়া দিলেই মানুষ সচেতন হইবে। আমরা আশা রাখি, মানুষ নিজের ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতন হইবে।