প্রণব মজুমদার
মহানগরের মিরপুরে নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকেন বাশিরা আলী। প্রবাসী স্বামী। কুয়েতে অনেক দিন। চাকরি করেন। মাসে মাসে অর্থ পাঠান। কিশোরী দুই মেয়ে পড়াশুনা করে। বড়টি নবম, ছোটটি সপ্তম। দুই জনই ব্যবহার করে পিতার পাঠানো দামি স্মার্টফোন। দিন-রাত তাদের ফোনে আসক্তি। এ নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাদের খুনশুটি লেগেই থাকে। ছোট মেয়ে সেলফি তুলে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে তা আপলোড করে। রাত যত গভীর হয় তার চ্যাটিংয়ের নেশাও তত বাড়ে। এক সময় লাভার বয় নামে এক পেশাদার অভিনেতা প্রেমিকের ফাঁদে পা রাখে অ্যাঞ্জেল ফারাহ নামের এই মেয়েটি। বিনিময় হয় সবকিছু। গভীর হয় টিনএজ ভালোবাসা। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়েটির সারল্য মনকে জয় করে প্রেমিক বালক। তারপর যা হবার তাই হয়। গোপনে তুলে রাখে মেয়েটির সঙ্গে তার শারীরিক মেলামেশার প্রমাণ। তা দিয়ে ছেলেটা তাকে ব্ল্যাকমেইলিং করতে থাকে। ভয়ে মেয়েটি ছেলেটির দাবিকৃত টাকা একাধিকবার মেটায়। খালার সাহায্যে অ্যাঞ্জেল গর্ভপাত করানোর পর এখন সে মানসিক রোগীতে পরিণত।
দ্বিতীয় ঘটনাটি কুমিল্লা শহরের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের ঝাউতলা শিশু মঙ্গল সড়কের এক অভিভাবক বিষয়টিকে সমাজের বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। সাইবার অপরাধের ঘৃণ্যতম শিকার তার অষ্টম শ্রেণির কন্যা। ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে ভেবে ফোন থেকে সকল অ্যাপস অপসারণ করে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিদেশ থেকে বোন ও নিকট আপনজন ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে বলতে গেলে বিনা পয়সায় কথা বলেন। অ্যান্ড্রয়েট ফোন থেকে তা বাদ দেন কীভাবে? কিছুতেই মেয়েকে রোধ করতে পারছেন না।
দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। এ নিয়ে বেশ উত্কণ্ঠার মধ্যে আছেন অভিভাবকগণ। তথ্য ও প্রযুক্তির জনপ্রিয় ফেসবুক, ইমো, ইন্সটাগ্রাম, ভাইবার, ওয়াটসঅ্যাপ ও লাইকি ইত্যাদির মাধ্যমে এ অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে। উঠতি তরুণ বিশেষ করে কিশোরীরা এ অপরাধের শিকার হচ্ছে বেশি। এদের জীবন হুমকির মধ্যে রয়েছে। দেশের যুবসমাজকে স্মার্টফোন ও অ্যান্ড্রয়েট ফোনের প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে না।
শহরের সীমা ছাড়িয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তির মোবাইল, ইন্টারনেট গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির নানা সুফল ক্রমেই মানুষের সহজলভ্য হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ক্রাইম বা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের পরিমাণও দ্রুত বেড়ে চলেছে। ক্রমেই অধিক হারে নিরীহ মানুষ এ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধের মধ্যে ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি প্রচার, ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণার ফাঁদ পাতার মতো সামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গি কর্মকাণ্ড সংঘটিত করা পর্যন্ত বহু রকম অপরাধই রয়েছে। দিনদিন বাড়ছে এসব অপরাধের পরিধি।
বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের গত বছরের এক গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে এক খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে যত সাইবার অপরাধ হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশের শিকার হচ্ছে কিশোরীরা। প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা ১১ ধাপে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে চারটিই নতুন। ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে ৬৭.৯ শতাংশ নারী। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের শিকারে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে তারা। এই অপরাধের শিকার নারীর হার ১৬.৩ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি। ছবি বিকৃত করে অনলাইনে অপপ্রচারের শিকার হওয়া নারীর হার ১১.২ শতাংশ। জরিপে বলা হচ্ছে, পর্নোগ্রাফিককেন্দ্রিক অপরাধ ২.২৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.০৫ শতাংশে। অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকির ঘটনা ১৩.৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭.৬৭ শতাংশ।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ হয়েছে। সাইবার অপরাধ দমনে সরকার নানা ধরনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগও নিয়েছে। সাইবার ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে গঠন করা হয়েছে সাইবার ইউনিট। ডিজিটাল আইন, সাইবার অপরাধ দমনে নানা ধরনের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের অভাবেই সাইবার অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা? ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কতটা আছে, সেটাও ভেবে দেখতে হবে। দেশে পর্যাপ্ত ফরেনসিক ডিভাইস নেই। উপযুক্ত ল্যাবও গড়ে ওঠেনি। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক অধ্যাপক শান্তি রঞ্জন ভৌমিক সাইবার অপরাধকে বর্তমান সময়ের বড় সমস্যা বলে চিহ্নিত করেন। করোনার ক্রান্তিকালে অবসর সময়কে কিশোর-কিশোরীরা শিক্ষামূলক ইতিবাচক কাজে লাগাচ্ছে না। বরং তারা পর্নোগ্রাফি ও অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। সমাজে ধর্ষণ ও বাল্যবিবাহ বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসা জরুরি।
n লেখক :প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
