হাত ধোয়া :গবেষণা কী বলে?

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ২১:০৫

মো. রহমত উল্লাহ

হাত ধোয়াকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বলে ধরা হয়। করোনা পূর্ববর্তী সাম্প্রতিক সময়গুলোতেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হাত ধোয়াকে প্রমোট করার জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারি বেসরকারি এসব উদ্যোগে প্রান্তিক পর্যায়ে খাবার আগে এবং টয়লেট করার পরে হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে বিশাল জনসচেতনতা তৈরি হয়েছে। যার ফলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুরক্ষাবিধির একটি ভালো অভ্যাস দেশের বড় অংশের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস এবং ইউনিসেফের ২০১৯ সালের যৌথ জরিপে দেখা যায়, দেশের ৬৪ শতাংশ মানুষের পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনসুবিধা এবং ৭৫ শতাংশ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুরক্ষার ন্যূনতম সুবিধা রয়েছে। ২০১৯ সালের সর্বশেষ বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) পাওয়া যায়—৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের একটি নির্দিষ্ট হাত ধোয়ার স্থান রয়েছে এবং ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারে হাত ধোয়ার স্থানে সাবান পাওয়া গিয়েছে। গবেষণায় পাওয়া যায়, সেসব পরিবারের সদস্যদের হাত ধোয়ার সম্ভাবনা তত বেশি যাদের ঘরে হাত ধোয়ার জন্য নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। ওপরের পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের হাত ধোয়ার হার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব।

করোনা সংক্রমণে অঞ্চলভেদে হাত ধোয়ার হারের সঙ্গে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে কিছু তথ্য সাম্প্রতিক সময়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষকের গবেষণা টেইলর অ্যান্ড ফ্রানসিস প্রকাশনা গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ রিসার্সে প্রকাশ পেয়েছে। গবেষকদ্বয়ের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল অনুসারে বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে হাত ধোয়ার হার কম সেসব প্রান্তে করোনা সংক্রমণ তুলনামূলক দ্রুত ছড়িয়েছে। গবেষণায় ১৫ এপ্রিল থেকে ১ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত প্রাপ্ত করোনা সংক্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এমআইসিএস ২০১৯ অনুসারে দেশের উত্তরপ্রান্তে হাত ধোয়ার হার সবচেয়ে বেশি এবং করোনা সংক্রমণের হার এ প্রান্তে সবচেয়ে কম (১ জুলাই পর্যন্ত)। জেলাভিত্তিক হিসেবে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ হাত ধোয়ার হার মেহেরপুর জেলায় (৮৬ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং পহেলা জুলাই পর্যন্ত মেহেরপুর জেলায় করোনার সর্বনিম্ন ৪০টি সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাত্ যেসব জেলায় হাত ধোয়ার হার তুলনামূলক বেশি, সেসব জেলায় সংক্রমণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে ততটা কম ঘটেছে।

এ গবেষণা প্রমাণ করে—করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং সহজতর উপায় হতে পারে হাত ধোয়া। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে যথাযথ হাত ধোয়ার পদ্ধতিকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশের অঞ্চল এবং আর্থসামাজিক অবস্থাভেদে হাত ধোয়ার হার বিভিন্ন। গ্রামের তুলনায় শহরের নাগরিকদের মধ্যে হাত ধোয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। অনুমিতভাবেই যেসব পরিবারে শিক্ষার হার তুলনামূলক বেশি এবং আর্থসামাজিক সূচকে অগ্রসর তাদের মধ্যে হাত ধোয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। হাত ধোয়ার হার বৃদ্ধির পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় পাওয়া যায়, যেসব ঘরে টেলিভিশন রয়েছে সেসব ঘরে হাত ধোয়ার হার তত বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে হাত ধোয়া নিয়ে সরাসরি কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হাত ধোয়ার হার বাড়ানোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।

শুধু করোনা সংক্রমণ নয় সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোলের গবেষণায় পাওয়া যায়, যথাযথ হাত ধোয়া ডায়রিয়াজনিত অসুস্থতা শতকরা ২৩-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগ এবং পেটের পীড়া কমাতেও হাত ধোয়া একটি কার্যকরী সমাধান। হাত ধোয়ার হার বাড়াতে বাংলাদেশি সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশংসনীয় হয়েছে। তবুও করোনা মহামারির সংক্রমণ আমাদেরকে সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে হাত ধোয়ার রীতির প্রচলনের গুরুত্ব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে হাত ধোয়ার হারে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে হাত ধোয়ার যথাযথ রীতি ছড়িয়ে দিয়ে সরকারি বেসরকারি সংস্থা নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করবে বলে সবার প্রত্যাশা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, মাস্টার্স ইন পাবলিক হেলথ,

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি