একটি ফুল কুঁড়িতেই শেষ

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ২২:২৮

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আজ রাসেলের জন্মদিন। ১৯৬৪ সালে রাসেলের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু তার জীবনটা শেষ হয়ে যায়, একটি ফুল কুঁড়িতেই শেষ হয়ে গেল, রাসেল আর ফুটতে পারেনি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে তাকে নির্মমভাবে চিরবিদায় নিতে হয়। এ ধরনের নৃশংস ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্য সরকার শিশুদের জন্য ভবিষ্যত্ রচনায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি শিশু যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে আগামী দিনে দেশের কর্ণধার হবে, তারা সুন্দর জীবন কাটাবে, আমরা এ লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি।’

গতকাল রবিবার গণভবন থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শহিদ শেখ রাসেলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভার্চুয়ালি এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ঘরে থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এক্সারসাইজ-আর্ট-খেলাধুলার মাধ্যমে ব্যস্ত থাকতে হবে, যাতে বিদ্যালয় খুললে সবাই যথাযথভাবে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে পারে। অভিভাবকদের এ বিষয়ে যত্নশীল হওয়া দরকার। শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের শিশুরা দেশপ্রেমিক হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। মানুষের সেবা করবে এবং নিজেদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত হবে। আমি কবি সুকান্তের ভাষায় এটিই বলতে চাই, ‘এই বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার অঙ্গীকার।’”

‘রাসেল’ নামটি তার মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার রাখা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি রোমন্থনে বলেন, ‘আব্বা বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখলেন।’ রাসেলের জন্মের সময়কার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাসেল যেদিন জন্ম নিয়েছে, সেই দিনের কথাটা এখনো আমার মনে পড়ে। একটা ছোট্ট শিশু আসবে, আমাদের পরিবারে, আমি কামাল-জামাল, রেহানা—আমরা সবাই খুব উত্সাহিত এবং বেশ উত্তেজিত ছিলাম, কখন সেই শিশুটির কান্না আমরা শুনব, কখন তাকে কোলে তুলে নেব। আর সেই ক্ষণটা যখন এলো, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের সময় ছিল। ছোট্ট শিশুটি আমাদের সবার চোখের মণি ছিল।’

শৈশবে বাবাকে কাছে না পাওয়ায় ছোট্ট শিশু রাসেলের বেদনার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘কী দুর্ভাগ্য তার, ১৯৬৪ সালের অক্টোবরের ১৮ তারিখ তার জন্ম। এরপর ১৯৬৬ সালে বাবা যখন ৬ দফা দাবি দিলেন, তিনি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ১৯৬৬ সালের মে মাসে তিনি (বঙ্গবন্ধু) বন্দি হয়ে গেলেন। ছোট্ট রাসেল কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবা কারাগারে। যখন সে একটু বড় হলো, তখন কারাগার থেকে বাবাকে কীভাবে নিয়ে আসবে, সে জন্য বাড়ি চলো, বাড়ি চলো বলে কান্নাকাটি করত। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন বাবা মুক্তি পান, তখন যে জিনিসটা সব সময় দেখতাম, রাসেল সর্বক্ষণ মনে হয় যেন ওর ভেতরে একটা ভয় ছিল যে কোনো মুহূর্তে বুঝি বাবাকে হারাবে, তাই বাবা যেখানেই যেতেন, যে কাজই করতেন, খেলার ছলে কিছুক্ষণ পর পরই একবার করে সে দেখে আসত যে বাবা ঠিক আছেন তো।’

রাসেলের নীরব কান্নার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন ২৬ মার্চ, ১৯৭১ সালে। ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে গ্রেফতার করা হলো। তারপর থেকে তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন, আমরা জানি না। আমার মাকেও বন্দি করা হলো। রাসেলও তখন বন্দি। আমার ভাই কামাল মুক্তিযুদ্ধে চলে যাচ্ছে, একসময় জামালও গেরিলা কায়দায় বন্দিখানা থেকে চলে গেল মুক্তিযুদ্ধে। রাসেলের চোখে সব সময় পানি। ঐটুকু একটা ছোট্ট শিশু, সে তার কষ্টটা কাউকে বুঝতে দিত না। যদি জিজ্ঞেস করতাম, কী হয়েছে? বলত, চোখে কিছু একটা পড়ে গেছে। তার যে নীরব কান্না, তা সে কখনো প্রকাশ করত না। কিন্তু তার কষ্টটা আমরা উপলব্ধি করতাম। এভাবে সে বড় হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে তার (রাসেলের) বিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে শহিদ শেখ রাসেলের ‘ম্যুরাল’ উন্মোচন করেন এবং ‘শহিদ শেখ রাসেল ভবন’ উদ্বোধন করেন। আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির সার্বিক সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ম্যুরালটি। ভার্চুয়াল এই অনুষ্ঠানে শেখ রাসেলের ওপর নির্মিত অ্যানিমেটেড ডকুমেন্টারি ‘বুবুর দেশ’-এর প্রদর্শনী এবং শেখ রাসেলের জীবনী নিয়ে গ্রন্থ ‘শেখ রাসেল আমাদের আবেগ’ এবং ‘স্মৃতির পাতায় শেখ রাসেল’ শীর্ষক দুটি বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ রাসেল শিশু-কিশোর সংসদের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠান থেকে প্রচারিত শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের কার্যক্রম-সংক্রান্ত ভিডিও চিত্র অবলোকন এবং এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এবং দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ল্যাপটপ বিতরণসহ অন্যান্য কার্যক্রমে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানটির সঙ্গে একাধারে গণভবন, শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র সংযুক্ত ছিল।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র প্রান্তে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থী ও শেখ রাসেল অনলাইন দাবা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে ল্যাপটপসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও বৃত্তি প্রদান করেন। শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. রকিবুর রহমান, মাহমুদুস সামাদ এমপি, কে এম শহীদুল্লাহসহ সংগঠনটির শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সদস্যবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ প্রান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটির চেয়ারম্যান এ কে এম রহমতুল্লাহ, উপ-কমিটির সদস্য সচিব ও দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ-বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী উপস্থিত ছিলেন। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা আদর্শ সুনাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে। করোনা ভাইরাসের মধ্যেও ঘরে বসে পড়ালেখা চালিয়ে যাবে। দেশের সেবায় নিজেদের উপযোগী করে গড়ে তুলবে।