সৈয়দ ফারুক হোসেন
২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায়ের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এবারের মূল আকর্ষণ বহু কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হল ছাত্রীদের জন্য নির্মিত বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের শুভ উদ্বোধন করা হবে। উপমহাদেশের ১৫০ বছরের অতি প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ ঢাকা শহরের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অতি মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। ১৮৫৮ সালে ব্রাহ্ম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দীননাথ সেন, প্রভাতীচরণ রায়, অনাথবন্ধু মৌলিক এবং ব্রজসুন্দর মিত্র। মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার কিশোরি লাল রায় চৌধুরী ১৮৮২ সালে এই বিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং তার পিতা জগন্নাথ লাল রায় চৌধুরীর নামানুসারে এর নামকরণ করেছিলেন জগন্নাথ স্কুল। এটি ১৮৮৪ সালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে উন্নীত হয়। এরূপ বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে এই ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি অবশেষে ২০০৫ সালের ২৮ নম্বর আইনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সরকারি জগন্নাথ কলেজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এই মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপমহাদেশের অগণিত স্বনামধন্য পণ্ডিতব্যক্তি জ্ঞান বিতরণে নিয়োজিত ছিলেন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। তারপরও স্বল্প সময়ে নানা সংকট এবং সমস্যা পেরিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সব ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে চলছে। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে প্রকৃত অর্থে যা বোঝানো হয়, তার সমস্ত কিছুই পরিপূর্ণ করবে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা। আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কাজে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে সত্যিকার অর্থেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরি, অনুসন্ধান, বিতরণ করছে। এগিয়ে চলছে এমফিল, পিএইচডি প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম। গবেষণা প্রকল্প থেকে বিশ্বমানের প্রকাশনা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির যাবতীয় প্রকাশনা নিয়ে বিগত তিন বছর ধরে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নিচ্ছে। আর অধিকতর গবেষণাধর্মী বই প্রকাশের লক্ষ্যে কাজ চলছে।
অবকাঠামোগত এবং আবাসিক সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কেরানীগঞ্জে ইতিমধ্যে নতুন ক্যাম্পাস তৈরির সব পদক্ষেপ এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণে নানা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ই-লাইব্রেরি ও ই-বুক ব্যবহার করতে পারছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে, কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মানসম্মত লেখাপড়া, পরীক্ষা ও ফলাফল নিয়মিতকরণ এবং শিক্ষকদের জ্ঞান অন্বেষী মনোভাব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে গৌরবময় স্থানে উপনীত করছে। পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। সুকুমার বৃত্তির চর্চার জন্য খোলা হয়েছে চারুকলা, নাট্যকলা, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিভিন্ন বিভাগে এমফিল এবং পিএইচডি ডিগ্রি চালু হয়েছে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে এমফিল এবং পিএইচডি ডিগ্রি পরিচালিত হচ্ছে। সন্ধ্যাকালীন এমবিএ ও এলএমএম কোর্স চালু রয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের প্রজেক্টরসহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠদান শুরু করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তায় ল্যাবরেটরির উন্নয়ন করা হচ্ছে, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট খোলা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা ক্লাস শুরু করেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঐতিহ্যবাহী পোগোজ স্কুলটি ‘পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ (আইইআর, জবি)’ নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। দেশপ্রেমিক নাগরিক এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে আরো সচেতন করে তুলতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগসমূহের জন্য আবশ্যিক পাঠ্যক্রম হিসেবে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রণোদনা প্রদানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তি দ্বিগুণ করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাসহায়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, ফেলোশিপ, প্রি-ডক্টরাল অ্যাওয়ার্ড প্রদান, একাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায় ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে মতবিনিময়সহ বিভিন্ন ধরনের শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণিত, ফিজিকস, প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের প্রার্থী নির্বাচনমূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ‘মুক্তিযুদ্ধ কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ শতাধিক এমফিল, পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধানের বাইরেও ইউজিসি ও সরকারি অর্থায়নে ১০০-এর অধিক গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি অনুষদের জার্নাল নিয়মিত বের হচ্ছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয় তথা পুরোনো ঢাকার পূর্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনেছেন। ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য আরো অধিকতর সুবিধা প্রদান ও যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলাতেও পরিবহনসুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও ছাত্রছাত্রীসহ সবাই যেন বিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে স্বাস্থ্যসম্মত ও সাশ্রয়ী খাবার পায় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এখন পর্যন্ত প্রতিটি চ্যালেঞ্জিং এবং দুরূহ কাজ এত দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে যা সবার জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি উন্নয়ন কাজে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদকে এবং প্রয়াত উপাচার্যবৃন্দ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম খান ও অধ্যাপক ড. আবু হোসেন সিদ্দিককে।
n লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
