ধর্ষণ মামলায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের এক অনন্য নজির গড়েছে ট্রাইব্যুনাল। বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচারকাজ শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাগেরহাটে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শিশু ধর্ষণ মামলার বিচার মাত্র ছয় কার্যদিবসে সম্পন্ন করেছেন। বিচারের ঐ রায়ে ধর্ষককে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের মামলার বিচার শেষ করাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা। তারা বলছেন, বছরের পর বছর চলে গেলেও সাক্ষী হাজির না হওয়ায় ধর্ষণ মামলার বিচার ঝুলে থাকে। এতে বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় ভিকটিম ও তার পরিবার। কিন্তু গতকাল সোমবার বিচার বিলম্বের এই নজির থেকে বেরিয়ে এসেছেন বিচারকেরা। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, ধার্যকৃত দিনে সাক্ষী হাজির করায় অতিদ্রুত এই বিচার শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
পিতৃহারা সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে আসামি আব্দুল মান্নান সরদারকে (৫৩) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মো. নূরে আলম। গতকাল দুপুর ১২টায় জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে তিনি রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করেন।
রায় প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, অবশ্যই এটি একটি ভালো পদক্ষেপ। এতে বিচারপ্রার্থী জনগণ দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা পাবে। দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় তিনি তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করব, অন্যান্য ট্রাইব্যুনাল এ ধরনের গুরুতর অপরাধের বিচার শেষ করতে উদ্যোগী হবে।’
এর আগে রবিবার দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টা বিচারক এই চাঞ্চল্যকর মামলার বাদী ও বিবাদীপক্ষের যুক্তিতর্ক শোনেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল মান্নান সরদার (৫৩) মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের মাকোড়ডোন গ্রামের ভূমিহীন আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার প্রয়াত আহম্মদ সরদারের ছেলে।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, মাকোড়ডোন গ্রামের ভূমিহীন আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় পিতৃহারা সাত বছর বয়সি শিশুটি তার মামার কাছে মানুষ হচ্ছিল। গত ৩ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে প্রতিবেশী আব্দুল মান্নান সরদার শিশুটিকে বিস্কুট খাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিজের ঘরে ডেকে নেয়। এরপর শিশুটিকে জোর করে ধর্ষণ করে মান্নান। পরে এ ঘটনা জানাজানি হলে ঐ দিন রাতেই মেয়েটির মামা মোংলা থানায় আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোংলা থানার এসআই বিশ্বজিত মুখার্জি তদন্তে ধর্ষণের প্রাথমিক সত্যতা পান। ১৬ জনকে সাক্ষী রেখে আট দিনের মাথায় তিনি আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে ১১ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
বাগেরহাট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) গোপাল চন্দ্র পাল বলেন, মামলাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় জুডিশিয়াল আদালত মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এ পাঠায়। আদালতের বিচারক গত ১১ অক্টোবর মামলাটি আমলে নিয়ে পরদিন চার্জ গঠন করেন। ১৩ অক্টোবর বাদীপক্ষের মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ১৪ অক্টোবর মামলার সংশ্লিষ্ট সাক্ষী চিকিত্সক, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নারী পুলিশ সদস্য ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ১৫ অক্টোবর আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনে সাফাই সাক্ষ্য নেন। রবিবার বাদী ও বিবাদীপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে সোমবার রায়ের দিন ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বাগেরহাট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ সহকারী কৌঁসুলি (এপিপি) রণজিত্ কুমার মণ্ডল বলেন, মামলাটি পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেছে। ঘটনার পরপরই আসামিকে গ্রেপ্তার, ধর্ষণের শিকার শিশুর ডাক্তারি পরীক্ষা, সাক্ষী হাজির এবং অভিযোগপত্র দাখিল যথাসময়ে করেছে পুলিশ। আইন মেনে শিশুটির ২২ ও ১৬১ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত দিনে এত কম সময়ে বাগেরহাট কেন, দেশের কোনো আদালতেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কোনো রায় ঘোষণা হয়নি বলেও জানান এই আইন কর্মকর্তা।
সম্প্রতি দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে দেশব্যাপী। এই সময়ে রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে বিচারহীনতা বা মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, তা অনেকটাই দূর হবে বলে মনে করেন তিনি।
নারী উন্নয়ন ফোরামের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ও সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান উন্নয়নকর্মী রিজিয়া পারভীন বলেন, এই রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারকার্যের যে দীর্ঘসূত্রতা ছিল বা সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের বিচার না পাওয়ার যে ভ্রান্ত ধারণা ছিল, তা অনেকাংশে দূর হবে। দেশের সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে মত দেন এই নারী নেত্রী।
মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিশুটির মামা মামলার বাদী মিলন শেখসহ অন্যান্য স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলেন, ‘রায়ে আমরা খুব খুশি। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিচার প্রক্রিয়ায় থাকা সবাইকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। কারণ এত দ্রুত সময়ে বিচার হবে তা আমরা ভাবতেও পারিনি।’
বাগেরহাট পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় বলেন, ধর্ষণের খবর পাওয়ামাত্র দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মোংলা থানার ওসি ইকবাল বাহার চৌধুরীকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণসহ স্বল্প সময়ের মধ্যে তদন্তসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছেন বলেই আদালত দ্রুত রায় দিতে পেরেছে। তিনি আরো বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে মামলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং আদালতের এ রায়ের ঘটনাটি সারা দেশে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
