অণুগল্প

স্বকীয়া

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২০, ১৯:২৬

 

হাতের ফাইলটার পাতা উলটাতে উলটাতে চট করে পাশে রাখা স্মার্টফোনের ওপর চোখ বুলিয়ে নেয় স্নেহা। আবার একটা মেসেজ এলো রাতুলের। নাহ! আর দেরি করা যাবে না। পাঁচটা বেজে গেছে, যদিও হাতের কাজ শেষ হয়নি। ফাইলে একটা মার্কিং দিয়ে রেখে উঠে পড়ে স্নেহা।

পাশের টেবিলের রিতা চোখ মটকায়। স্নেহা তড়িঘড়ি বেরিয়ে যাবার মুহূর্তে হাত দিয়ে হালকা চাপ দেয় রিতার কাঁধে। রিতাও ওর হাতটা ছুঁয়ে দেয়। সিঁড়িতে নামতে নামতেই স্নেহা ফোন করে বাসায়, শাশুড়ি ফোন ধরেন, ‘বৌমা আজো কি তোমার ফিরতে দেরি হবে?’

‘হ্যাঁ, মা। হঠাত্ একটা আর্জেন্ট মিটিং পড়ে গেল। বাবাই কী করছে মা?’

‘ও ঘুমুচ্ছে। ওকে নিয়ে ভেবো না। যা দিনকাল পড়েছে বেশি দেরি কোরো না।’

‘আচ্ছা, মা, রাখি’ বলে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে স্নেহা। ব্যক্তিত্বময়ী সাহেরা বেগমকে মিথ্যে বলতে বুকটা কাঁপছিল একটু।

বারো বছরের বিবাহিত জীবনে স্বামী, শ্বাশুড়ি আর দশ বছরের বাবাইকে নিয়ে ভরা সংসার। শ্বশুর গত হয়েছেন তিন বছর হতে চলল। তবে জীবনটা কেমন ব্যস্ততায় ভরা। শত ব্যস্ততার মাঝে সপ্তাহে এক-আধ দিন এই গোপন অ্যাডভেঞ্চারের লোভ ও ছাড়তে পারে না। রাতুলের চোখে সেই প্রথমদিনের মতো মুগ্ধতা স্নেহা খুব উপভোগ করে। ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে কী গভীর প্রেম ছিল ওদের। লেখাপড়ায় দুজনেই দুর্দান্ত। রাতুল বলত, দেখো এমনি করেই তোমায় ভালোবাসব সারা জীবন।

পাস করেই স্নেহা নামকরা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে এই চাকরিটা পেয়ে গেল। রাতুল ভালো ভালো চাকরির অফার পেলেও করল না। ওর এক জেদ—ব্যবসা করবে। সেটা তো চাট্টিখানি কথা নয়। এদিকে স্নেহার বয়স বেড়ে যাচ্ছিল, অনেক সুপাত্র হাতছাড়া হচ্ছিল। এসব নিয়েই দুই পরিবারের টানাপোড়েন। রাতুল ছিল অবিচল। আজ বাংলাদেশের আইটি বিজনেসে রাতুল আহমেদ একটা গুরুত্বপূর্ণ নাম।

অতীত ভাবতে ভাবতে কখন অটো এসে পৌঁছে গেছে রেললাইনটার পাশে, বুঝতেই পারেনি স্নেহা। এখানে প্রায়ই আসে ওরা সমাজ-সংসার, দায়দায়িত্ব সমস্ত ব্যস্ততাকে পিছনে ফেলে। কোনো কোনো দিন লং ড্রাইভে চলে যায় নিরিবিলি কোনো নদীর ধারে বা ফাঁকা মাঠে। কখনো কোনো রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেল নাইট ডিনার। বিশেষ দিনগুলোতে উপহার থাকে বই বা গানের সিডি আর অনেক অনেক ফুল।

ড্রাইভারকে টাকা দিতে দিতে এক ঝলক দেখে নেয় রাতুলকে। কী স্মার্ট! বয়স মধ্যচল্লিশ ছুঁয়েও একফোঁটা মেদ জমতে দেয়নি শরীরে। শরীরের পাশাপাশি মনেরও যত্ন নেয়া ওর অভ্যাস। তাই সব সময় হাসিখুশি, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা।

রাতুলের সংস্পর্শে থেকে স্নেহাও নিজেকে বদলেছে  প্রচুর। নইলে সংসার, বাচ্চা আর অফিস সামলাতে সামলাতে ও নিজেকে হারাতেই বসেছিল। দূর থেকে স্নেহাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে উদগ্রীব রাতুল। মনে হয় সদ্য প্রেমে পড়া যুবক। রেললাইনের পাশে একটা জংলি ফুলের গাছে বেগুনি রঙের থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। রাতুল স্নেহার হাত ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে আনে একগুচ্ছ বেগুনি ভালোবাসা। স্নেহার খোঁপায় গুঁজে দিয়ে গভীর দৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সেই প্রথম দিনের মতো আজো ভালোলাগার আবেশে তাকে জড়িয়ে রেখেছে। সংসার নামক বৃত্তে ও ঘুরপাক খেতে খেতে মুখ থুবড়ে পড়েনি। সংসার কথাটা মাথায় আসতেই বাবাইয়ের মুখটা ভেসে উঠল...নাহ! বড্ডো দেরি হয়ে গেল, এবার ফিরতে হবে।