কথায় আছে—সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল। এই ক্ষেত্রে মালের পরিবর্তে যদি জমি হয়, তাহা হইলে নানান কৌশলে দখলের উত্সব চলে। সরকারি বনভূমিও ইহার বাহিরে নহে। সরকারি বনভূমির বৃহত্ একটি অংশ দখল করিয়া ভূমিখেকো শিল্পমালিক কিংবা ক্ষমতাশালীরা গড়িয়া তুলিয়াছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সমগ্র দেশে গত পাঁচ দশকে বন ও বনভূমির পরিমাণ কমিয়া তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়া আসিয়াছে। গত সোমবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বলা হইয়াছে, দেশে মোট বনভূমির ২ লক্ষ ৮৭ হাজার ৪৫২ একরই বেদখল হইয়া রহিয়াছে। বন অধিদপ্তরের হিসাবে—সংরক্ষিত, বিজ্ঞপ্তিত, রক্ষিত, অর্জিত বা অর্পিত ও অশ্রেণিভুক্ত মিলাইয়া দেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ৪৬ লক্ষ ৪৬ হাজার ৭০০ একর। এই হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ বনভূমি বেদখল হইয়া রহিয়াছে। আর এই সকল জমি অবৈধভাবে দখল করিয়াছে প্রায় ৯০ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে বনভূমি বেদখলের কারণ হিসাবে বলা হইয়াছে, সিএস রেকর্ড মূলে রেকর্ডভুক্ত বনভূমি পরবর্তীকালে এসএ/আরএস/বিএস জরিপে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ডভুক্ত হইয়াছে। অনেক জমি সিএস খতিয়ানে বন বিভাগের মালিকানায় ছিল। অথচ পরে তাহা এসএ খতিয়ানে ডিসি অফিসের অধীনে দেওয়া হইয়াছে। ডিসি অফিস সেইগুলি আবার বিভিন্নভাবে লিজও প্রদান করিয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বনভূমির মধ্য দিয়া বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, বিশেষ করিয়া সড়ক নির্মাণের ফলে ইহার দুই পাশে বনভূমি দখলের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
আমরা দেখিয়াছি, শুধু বনের জমি নহে, সরকারের বিভিন্ন ধরনের মূল্যমান জমি প্রভাবশালীরা দখল করিতে মরিয়া থাকে। এই সকল ক্ষেত্রে ভূমি দখল হয় বিচিত্র প্রক্রিয়ায়। গত বত্সর অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের মানুষের ভূমি অধিকার এবং সার্বিক ভূমি ব্যবস্থাপনা লইয়া একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, সরকারি ভূমি দখলের সহিত যাহারা যুক্ত তাহারা সমাজের উচ্চশ্রেণির প্রভাবশালী। দেখা গিয়াছে, যাহারা সরকারি ভূমি বেদখলে যুক্ত, তাহারা প্রায় সকলেই সম্পদশালী। তাত্পর্যপূর্ণভাবে ঐ গবেষণায় ইহাও উঠিয়া আসিয়াছে যে, সরকারের যেই সকল এজেন্সি রহিয়াছে, বিশেষ করিয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করিবার জন্য যাহারা নিযুক্ত থাকেন, তাহারা এবং অন্যান্য প্রশাসনের একাংশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন লইয়াই প্রভাবশালীরা এই সকল ভূমি দখলের কাজ করিয়া আসিতেছেন। সুতরাং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি যথার্থই বলিয়াছে যে, এই বেদখল হওয়া ভূমিসমূহ ফেরত আনিতে হইবে। সেই জন্য যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াও বাহির করিতে হইবে।
আমরা মনে করি, সরকারের যেই সকল মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিপুল ভূমি রহিয়াছে, তাহাদের প্রতিটি পর্যায়ে সচেতন থাকিতে হইবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিভাগ যদি তাহাদের স্ব স্ব দায়িত্ব গত পাঁচ দশক ধরিয়া যথাযথভাবে পালন করিত, তাহা হইলে কেবল বন বিভাগেরই ১৬ শতাংশ ভূমি বেদখল থাকিত না। এই সমস্যার জঞ্জাল দশকের পর দশক ধরিয়া জমিয়াছে। তাহা পরিষ্কার করিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিভাগকেই আন্তরিক হইতে হইবে। নচেত্ এই সিলসিলা চলিতেই থকিবে।
