আসন্ন শারদ উত্সব :পরিমিত ভাবনা

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২০, ২১:০৫

অজয় দাশগুপ্ত

শারদীয় দুর্গাপূজা আসন্ন। এবার কঠিন সময়ে উদ্যাপন করতে হবে এই উত্সব। আমাদের দেশে একটি জনপ্রিয় স্লোগান হচ্ছে—ধর্ম যার যার উত্সব সবার। কথাটা সত্য। হাজার ইন্ধন প্রলোভন আর বাদানুবাদের পরও বাঙালির উত্সব সবার। সাম্প্রদায়িক শক্তি এ জায়গাটিতে পরাজিত হয় বারবার। মানুষ জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে উত্সবে সামিল হয়। বাংলাদেশ হয়ে ওঠে রঙে রসে এক অনিন্দ্য সুন্দর জন্মভূমি। এই চেতনা বজায় রাখতে যারা কষ্ট করেন বা যাদের কারণে আমরা তা পারি সেসব মানুষ আজ বড় কষ্টে আছেন। দেশ জাতি রাষ্ট্র সবকিছুতে আজ এক ভয় আর সংশয় কাজ করছে। দুনিয়া জুড়ে এক ঘাতক অদৃশ্য দুশমন নির্বিচারে তার মরণ কামড় বসিয়ে চলেছে। যার নাম কোভিড বা করোনা।

আমি গত বছর পূজার সময় দেশে ছিলাম। কাছ থেকে দেখেছি কতটা পালটে গেছে দৃশ্যপট। এখন মূল পূজার চেয়ে আকর্ষণের বিষয় হচ্ছে নাচগান আর ভিড় করে ঘুরে বেড়ানো। সকাল থেকে বিকাল প্যান্ডেলগুলো খালি। তখন পুরোহিত আর আয়োজক ছাড়া গুটিকয় ধার্মিক মানুষ। সন্ধ্যা গড়াতেই শুরু হয় মানুষের সমাগম। না মানে কোনো আইন, না কোনো বিধিনিষেধ। যত রাত বাড়ে তত বাড়ে নাচগান। মধ্যরাত এমনকি শেষ রাত পর্যন্ত আনন্দের নামে যে উল্লাস আর হইচই তা কোনোভাবেই সমর্থন করি না। এবারের করোনাকালে ঘরে ঘরে মানুষ অসুস্থ। আপনি আমি আমরা কেউই জানি না কে সুস্থ আর কে বহন করছে জীবাণু। ফলে এবার দরকার কঠোর সতর্কতা।

প্রত্যেকটি নেগেটিভ বিষয়ের ভেতর একটি হলেও পজিটিভ বিষয় থাকে। ভালো করে দেখলে বোঝা সম্ভব করোনার এই দুঃসময়ে সুযোগ এসেছে শুদ্ধচার মেনে ধর্ম পালনের। আমি ব্যক্তিগতভাবে ধার্মিক মানুষ নই। তবে আমি এটা জানি আমাদের উপমহাদেশ ও দুনিয়া জুড়ে ধর্ম বা আচার অনুষ্ঠানই এখনো সবকিছুর নিয়ামক। এবার আমাদের ঐক্য আর শৃঙ্খলার কঠিন পরীক্ষা দেওয়ার পালা। মাইকিংও একটি বড় উত্পাত। এসব উত্পাত মূলত সামাজিক শব্দদূষণের বাইরে কোনো কাজে আসে না।

একটা বিষয় এবার মাথায় রাখতেই হবে। ঘরে ঘরে বিশেষত নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ঘরে অভাব। যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা করুণ। সঙ্গে এমন কিছু পেশা আছে যারা আজ অসহায়ত্বের কবলে পড়ে ধুঁকছে। এরা না পারে হাত পাততে না পারে সহ্য করতে। এসব মানুষের পাশে না দাঁড়ালে দুর্গা কি আসলেই তার বিপদহারিণী রূপ পাবেন? আমি এ কথা বলি না এগুলো কেবল হিন্দুদের জন্য হিন্দুরা করবে। আমি বলব দেশ ও সাধারণ জনগণের জন্য করা দরকার। আমাদের এই উত্সবের নামই তো সর্বজনীন। আর সর্বজনীনতার বড় নিয়মই হচ্ছে সবার যোগে জয়ী হওয়া। সবার আনন্দে উত্সবকে বরণ করা। এ বছর আমরা কোভিডে কত প্রিয় মানুষের কত আত্মীয়-পরিজন হারিয়ে ফেলেছি। অকালে অবেলায় চলে গেছেন কত সেলিব্রেটি কত কাছের মানুষ। এই যুদ্ধে ঘোরতর লড়াই করে যারা টিকে গেছেন তারাও আমাদের প্রণম্য। প্রণম্য সেসব ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী ও জরুরি পরিষেবার মানুষজন। যারা না থাকলে আমরা বাঁচতে পারতাম না। এই পূজায় তাদের এনে তাদের সম্মানিত করা হোক। আনার চেয়েও জরুরি তাদের কাছে যাওয়া। আর অসহায় মানুষকে ভরসা যোগানো।

শারদ উত্সবে পরিমিতি সীমাবদ্ধ আয়োজনসহ সাজসজ্জা ও আলো মাইকিংয়ের খরচ বাঁচিয়ে জনকল্যাণে তা ব্যয় করা পূজাকে দেবে নতুন গৌরব। আমাদের জীবনের অমঙ্গল সামাজিক অসংগতি দূরে এই ধরনের শুভবোধ এখন জরুরি। আমরা সবাই আজ ধর্ষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই উদ্বিগ্নতা অকারণ কিছুতে তৈরি হয়নি। মা-বোন, জায়া-কন্যারা আজ অনিরাপদ। তাদের যদি অভয় দেওয়া না যায় তো দেবী দুর্গার স্বরূপ কাজে আসবে কীভাবে? দেবীরূপী জননীর আগমন হোক অভয় নিয়ে। তার এবারের আগমনের সঙ্গে যুক্ত হোক বাঙালির শুভবোধ। আমরা যেমন একটি শান্তি ও সমৃদ্ধির দেশ চাই তেমন করেই আয়োজন করা হোক পূজার।

অসাম্প্রদায়িকতা কোনো কথার কথা না। এটা অনুশীলন আর আচারের বিষয়। বাংলাদেশ বহু কঠিন সময়ে সে গুরুদায়িত্ব পালনে তার বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে। এবারও তাই হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করি। করোনার এই কঠিন চরম সময়ে ধৈর্য সহিষ্ণুতা আর শান্তির ভেতর দিয়ে উদ্যাপনের প্রস্তুতি জাতিকে ভরসা দিক।

n লেখক :সিডনি প্রবাসী লেখক