ভোটারদের মধ্যে ইভিএম-ভীতির কারণ কী?

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২০, ২১:২৫

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন তথা ইভিএম লইয়া সময়ে সময়ে নূতন নূতন প্রশ্ন দেখা দিতেছে জনমানসে। ইভিএম ভালো কি মন্দ, সেই বিষয়ে আমরা যাইব না। আমরা বরং ইভিএম-সংক্রান্ত কিছু ব্যাবহারিক চিত্র পুনর্বীক্ষণ করিতে পারি। গত বৃহস্পতিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত ইভিএম-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে—প্রচলিত ব্যালটের তুলনায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট পড়িবার হার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বিগত ১০টি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনের প্রদত্ত ভোটের হার বিশ্লেষণ করিয়া দেখা গিয়াছে, ব্যালটের চাইতে ইভিএমে ভোট পড়িবার হার ৩৯ শতাংশেরও কম। বিগত পাঁচটি সংসদীয় আসনে ব্যালটে প্রতি আসনে গড়ে ভোট পড়িয়াছে ৫৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে বিগত পাঁচটি আসনে গড়ে ইভিএমে ভোট পড়িয়াছে মাত্র ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাত্ ব্যালটের চাইতে ইভিএমে ভোট কম পড়িয়াছে ৩৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবশ্য ইহার ব্যাখ্যায় করোনাভীতি ও ইভিএমের নেতিবাচক প্রচারণাকে দায়ী করিয়াছেন। কিন্তু করোনা-পূর্ববর্তী আরো কিছু ইভিএম-সংক্রান্ত সংবাদে বিষয়টির ‘কঠিন’ দিকটিও উঠিয়া আসিয়াছে। ব্যালট পেপারের পরিবর্তে ইভিএম পদ্ধতি আবিষ্কৃত হইয়াছিল ‘ভোট লুট’ রুখিতে ও খরচ কমাইতে। ব্যালট কাগজে সিল মারার পরিবর্তে ইভিএমে একজন ভোটার তাহার পছন্দের প্রতীকের পাশের সুইচটি টিপিয়া ভোট প্রদান করিতে পারেন। ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম এই পদ্ধতি চালু হয়, যদিও বর্তমানে পৃথিবীর ৯০ শতাংশ দেশে ইভিএম তথা ই-ভোটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় না। কেন হয় না, আমরা সেই দিকেও আগাইলাম না।

বাংলাদেশে প্রচলিত ইভিএমের মূলত তিনটি অংশ থাকে। ডেটা যাচাই করিবার যন্ত্র বা কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট যন্ত্র ও মনিটর। ডাটা যাচাই-যন্ত্রটি কাজ শুরু করিয়া থাকে দুইটি অ্যাকসেস কার্ডের মাধ্যমে। ইহার একটি থাকে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিকট, অন্যটি সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের কাছে একটি পিন নম্বর থাকে, যাহা ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটারের সংরক্ষিত তথ্য জানা যায়। মেশিনটির একটি অংশে ভোটারের আঙুলের ছাপ দেওয়ার জায়গা রহিয়াছে। সেইখানে আঙুলের ছাপ দেওয়া হইলে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত হয় এবং তিনি নির্দিষ্ট বোতাম টিপিয়া তাহার ভোটটি প্রদান করেন। করোনা-পূর্ববর্তী সময়ে এই বত্সর জানুয়ারি মাসে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ভোটের তিন দিন আগে বিভিন্ন কেন্দ্রে ইভিএমের প্রদর্শনী হয়। সেই সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর হইতে জানা যায়, ডেমো ভোট শিখিতে আসিয়া অনেক সাধারণ মানুষ বলিয়াছেন, ‘আসলে ভালো কইরা বুঝি নাই। ভোট দিতে আসব। বুঝতাছি না, দিতে পারব কি না।’ আরেক জন বলিয়াছেন, ‘আমি তো তাও একটু শিক্ষিত, যারা অশিক্ষিত তারা তো আরো বুঝব না।’ কয়েক জন অবশ্য বলিয়াছেন, ‘দেখে মনে হলো, কাগজের ভোটের চেয়ে এটা ভালো। সময় কম লাগছে।’

বাস্তবতা হইল—সিংহভাগ সাধারণ মানুষের ভিতরেই যন্ত্রভীতি কাজ করে। ইভিএম একটি যন্ত্র বিধায় ইহাকে পাশ কাটাইতে চাওয়া নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক নহে। তবে বিশ্বের বেশির ভাগ জায়গায় ইভিএম পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ কি না, তাহার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল—আমাদের সিংহভাগ সাধারণ ভোটার প্রকৃতই ইভিএম বুঝেন কি না। ইহার মীমাংসাও জরুরি।