মধুপুর বনে মিলল লজ্জাবতী বানর!

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২০, ২২:৪৬

মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় থাকা লজ্জাবতী বানরের সন্ধান মিলেছে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে। গত বুধবার মধুপুর জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের লহুরিয়া বিটের গভীর জঙ্গলে এক শৌখিন ভিডিওগ্রাফারের  ক্যামেরায় ধরা পড়ে এটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরে সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওগ্রাফার আব্দুর রহমান রুপম জানান, নিজস্ব অনলাইন চ্যানেলে বানর ও হনুমানের ডকুমেন্টেশন করার সময় বনের বাঁশঝাড়ে ঐ লজ্জাবতী বানরকে আরাম করতে দেখা যায়। পরে স্থানীয় বনকর্মীরা সেখানে হাজির হন।

দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, ইতিপূর্বে মধুপুর বনাঞ্চলে লজ্জাবতী বানর দেখা যায়নি। বণ্যপ্রাণী গবেষক ও আইইউসিএনের বানর বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য তানভীর আহমেদ জানান, বিশ্বে প্রাইমেট বর্গের ৭৯ গোত্রের ৫০৪ প্রজাতির বানর রয়েছে। তবে বাংলাদেশে              রয়েছে ১০ প্রজাতির বানর ও হনুমান। এর ছয় প্রজাতি বিপদগ্রস্ত তালিকার। আর লরিসিডি পরিবারের লজ্জাবতী বানর মহাসংকটাপন্ন। এটি নিশাচর ও লাজুক স্বভাবের। দৈর্ঘ্যে ২৬ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১ থেকে ২ কেজি। মাথা গোলাকার, মুখ চ্যাপ্টা, মায়াবী চোখ বেশ বড়। তবে কান ও লেজ ছোট। শরীর ঘন ময়লাটে সাদা-বাদামি লোমে ঢাকা। মাথার ওপর থেকে গাঢ় রঙের দাগ পিঠ বেয়ে নিচে গেছে।

এরা একাকী ও নীরবে থাকতে পছন্দ করে। সারা দিন গাছের উঁচু কোটরে অথবা পাতাভরা ঘন ডালের আঁধারে ঘুমিয়ে কাটায়। সন্ধ্যার পর একা বা জোড়ায় খাবারের সন্ধানে নামে। বাঁচে বড়জোর ২০ বছর। বছরে একবার একটি বাচ্চা প্রসব করে। চিরসবুজ ও বৃষ্টিপাতপূর্ণ ঘন বন বা বাঁশঝাড় এদের খুব পছন্দ।  শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে। পোকামকড়, ছোট ফলমূল, গাছের নরম বাকল এবং জিগার আঠালো খাবার খুব পছন্দের। পরাগায়ণে ভূমিকা রয়েছে। বিগত দুই দশকে এদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। দেখতে সুন্দর বলে আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে এর চাহিদা বেশি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এদের দেখা মেলে।

এদের বৈশিষ্ট্য হলো, এরা বিষাক্ত প্রাণী। রেগে গেলে আত্মরক্ষার জন্য গ্রন্থিথলি থেকে মুখে বিষ আনে এবং কামড়ে দেয়। এর কামড়ে বিষাক্রান্ত রোগীর চিকিত্সা ব্যয়বহুল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বানরবিদ ড. ফরিদ আহসান ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত লজ্জাবতী বানর নিয়ে গবেষণা চালান। তার গবেষণাপত্র থেকে দেখা যায়, ময়মনসিংহ বন বিভাগের শেরপুরের বালিজুড়ি রেঞ্জের গজারি বনে লজ্জাবতী বানর রয়েছে। কিন্তু ২০১০ সালে এখানকার বন লজ্জাবতী বানরশূন্য হয়ে যায় বলে এক বিভাগীয় রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক জামাল হোসেন তালুকদার জানান, বছর দেড়েক যাবত্ লজ্জাবতী এই বানর মধুপুর বনে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। অতিথি হিসেবে এর আগমন। ঠিক কখন, কীভাবে এটি মধুপুর বনাঞ্চলে এসেছে তা বলা যাচ্ছে না। টাঙ্গাইল  বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরুল হক জানান, মধুপুর বনাঞ্চলে লজ্জাবতী বানরের বসবাসের কোনো ইতিহাস নেই। এটি পুরোটাই চিরহরিত্ বনের প্রাণী। শুষ্ক মৌসুমে মধুপুর বনাঞ্চল পাতাশূন্য হয়ে গেলে সাধারণ বানর ও হনুমানের খাবারের সংকট চলে। এখানে লজ্জাবতী বানরের টিকে থাকা খুবই কঠিন।