জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দেশসেরা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। রাজধানীর আদদ্বীন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে জীবনের অন্তিম মুহূর্ত অতিবাহিত করছেন তিনি। ব্যারিস্টার রফিক বাংলাদেশের ইতিহাসে এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি একাধারে দেশের প্রধান চারটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদ জিয়া, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এবং জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আইনজীবী ছিলেন। একজন অরাজনৈতিক ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে ব্যারিস্টার রফিক আইন পেশায় পাঁচ দশক সক্রিয় ছিলেন। দানবীর ও সমাজসেবক হিসেবে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতাল, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, গাজীপুরের চন্দ্রা ট্রমা হাসপাতাল, আদদ্বীন হাসপাতালসহ বিভিন্ন দাতব্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, ‘রফিক-উল হক নিজেই ইতিহাস। বাংলাদেশের আইনের ইতিহাসে উনি একজন আইকন। আমি ওনার সরাসরি ছাত্র ছিলাম। আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। শিক্ষক হিসেবে যত্ন করে পড়াতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কোর্টে এলাম, তখন দেখলাম উনি যে মামলার শুনানি করতেন, সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে তা করতেন। তার পরিশ্রম তুলনাহীন। আইনজীবী হিসেবেও ওনার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছে। অনেককে হারাতে পারলেও মামলায় কখনো তাকে হারাতে পারিনি। যখন বিচারকের আসনে বসলাম, তখন অনেক সুন্দর সুন্দর মামলা নিয়ে আসতেন। একটা খারাপ মামলাকে কতটা ভালোভাবে আদালতে উপস্থাপন করতে হয়, সেটা তিনি দেখিয়েছেন। আমি দোয়া করছি, উনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন।’ তিনি বলেন, ব্যারিস্টার রফিক ছিলেন দিলদরিয়া মানুষ। কোর্টে মামলা নিয়ে অনেক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে, কিন্তু মামলা শেষে তিনি মনে রাখেননি কখনো। সমাজসেবায় তিনি বড় অবদান রেখেছেন। বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাসেবার জন্য উনি কোটি কোটি টাকা দান করেছেন।
সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘ব্যারিস্টার রফিক অসম্ভব প্রতিভাবান এক আইনজ্ঞ। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কয়েক জন আইনজীবীর নাম উল্লেখ করলে তার নাম আসবে। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন তিনি শুধু সাংবিধানিক মামলার শুনানিতে অংশ নিতেন। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের যে মর্যাদা, তা তিনি বজায় রেখেছিলেন। উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন সেই দোয়া করছি।’
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘তিনি একজন ভদ্র ও অমায়িক মানুষ। খুবই ভালো আইনজীবী। দোয়া করি, তিনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ব্যারিস্টার রফিক একজন পরিপূর্ণ আইনজ্ঞ। সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই তিনি মামলার শুনানিতে অংশ নিতেন। অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ। অনন্যসাধারণ আইনজীবী। আর উনি এটা হয়েছেন নিজের মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে। সমাজসেবায় প্রচুর অবদান রেখেছেন।
সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা :
গত ১৫ অক্টোবর আদদ্বীন হাসপাতালে ভর্তি হন ৮৫ বছর বয়সি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। প্রথম দিকে তাকে কেবিনে রেখে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবস্থা কিছুটা জটিল হওয়ায় তাকে হাই ডিপেনডেন্সি কেয়ার ইউনিটে (এইচডিইউ) ভর্তি করা হয়। গত ২০ অক্টোবর তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হলে তাকে দ্রুত লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ঐ সময় তার ব্লাডপ্রেশার ও অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যায়। এতে তিনি শকে চলে যান। এখন পর্যন্ত তিনি সেখানেই আছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার আদদ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ‘মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে স্যারকে সব ধরনের চিকিত্সাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তার রক্তের রিপোর্টগুলো ভালো আসেনি। এক্স-রে রিপোর্ট কিছুটা ভালো। তবে অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। ওনার অবস্থা সংকটাপন্ন। আমরা দোয়া করছি, স্যার যেন দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন।’
