আলু, আলুর দাম ও আলুর দোষ!

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ২১:২৬

চিররঞ্জন সরকার

চালের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এক সময় স্লোগান চালু হয়েছিল, ‘ভাতের বদলে আলু খান চালের ওপর চাপ কমান।’ ভেতো বাঙালি একটু একটু করে আলুমুখী হওয়ার পর এখন আলুতেও টান। দেশীয় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত আলু মজুত থাকলেও রীতিমতো লাগামহীনভাবে বাড়ছে প্রতিদিনের রান্নায় অপরিহার্য এই পণ্যটির দাম। ৩০ টাকার আলু ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর হিসাবে এক বছরে আলুর দাম বেড়েছে ১১১ শতাংশ। চাল, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেলের পর এবার আলুর এ রেকর্ড দাম বৃদ্ধিতে রীতিমতো ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। কিন্তু কেন বাড়ছে আলুর দাম?

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে প্রতি বছর আলুর চাহিদা ৭৭ লাখ টন। এর বিপরীতে গত অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ৯ লাখ টন আলু উত্পাদন হয়েছে। অর্থাত্ চাহিদা মেটানোর পরও আরো ৩২ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থাকবে। তাই আলুর দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, এ বছর দেশের চার দফা বন্যায় উত্তরাঞ্চলসহ ৩৭টি জেলার সবজি খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যে কারণে এবার ৫০ টাকার নিচে কোনো ধরনের সবজি নেই। আর এর প্রভাব পড়েছে আলুর ওপর। আরেকটি কারণ হলো, করোনায় শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় দাম কম হওয়ায় তারা আলুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষকে সহায়তার জন্য ত্রাণ হিসেবে চালের পাশাপাশি আলুও দেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে করোনার সময় মার্চের শুরুতে প্রতি কেজি আলুর দাম ২০ টাকা থাকলেও এখন তা ৬০ টাকা ছুঁয়ে গেছে।

আলুর দাম বাড়ার পেছনে অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে অসাধু সিন্ডিকেট। সুযোগ বুঝে তারা বিনা কারণেই আলুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অশুভ চক্র চাল, পেঁয়াজ ও সয়াবিন তেলেরও সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছে। এবার অন্যান্য সবজির দাম বাড়ায় আলু নিয়ে কারসাজি শুরু করছে। সরকার অবশ্য আলুর দাম বেঁধে দিয়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু ৩০ টাকা হিসেবে বিক্রির জন্য দর বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, কোল্ড স্টোরেজ গেটে প্রতি কেজি আলু ২৩ টাকা। আর পাইকারি বাজারে ২৫ টাকা কেজি আলু বিক্রি হবে। খুচরা পর্যায়ে তা ৩০ টাকায় ভোক্তারা কিনবেন।

যদিও সরকারনির্ধারিত দামে তো বিক্রেতারা চাল-আলু বিক্রি করছে না। এর আগে চাল ও পেঁয়াজের দামও সরকার বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু তা-ও বিক্রেতারা মানেনি। এই ব্যবসায়ী চক্রের কাছে সরকার হলো সার্কাসের জোকার। যাদের কাজ লোক হাসানো। আসল কসরত্ অর্থাত্ সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো এবং নিজেরা ধনী হয়ে মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালনের মহত্ দায়িত্বটি তারাই পালন করেন!

যাহোক, আলুর সঙ্গে আমাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। কেবল খাদ্য হিসেবে নয়, শব্দ হিসেবেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আলুর বহুবিধ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক: কেউ যদি দেখতে নাদুসনুদুস হন, বন্ধুরা তাকে আদর করে ‘আলু’ বলে ডাকেন। আবার কেউ যদি একটু বোকাসোকা হন, তাকেও সবাই ‘আলু’ বলেই ডাকে। কাউকে হুমকি দেওয়া হলে বলা হয়: শয়তান, আজ তোকে মেরে একেবারে আলু ভর্তা বানিয়ে ফেলব! ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বলা হয় :সে পরীক্ষায় আলু পেয়েছে! ঠিক তেমনিভাবে সতর্কতার ক্ষেত্রে: কীরে, তুই তো দিন দিন একদম আলু হয়ে যাচ্ছিস! কম খা বেটা! রূপচর্চার ক্ষেত্রে: হায় হায়, তোমার চোখের নিচে তো কালি পড়ে গেছে। আলু বেটে চোখের নিচে লাগাও! দাম্পত্য কলহের ক্ষেত্রে: তোমার সংসারে এসে আলু ভর্তা খেতে খেতে আমার জান তামা তামা! আঘাতের ক্ষেত্রে: ওরে বাপরে, থামের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আমার কপালে আলু গজিয়ে গেল! ছোটবেলায় আমাদের প্রিয় ছড়া ছিল: রেলগাড়ি ঝম ঝম, পা পিছলে আলুর দম! তবে সুস্বাদু হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা সম্ভবত কাউকে আলু ভর্তা বানানো!

শুধু সবজি নয়, আলুকে শাক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারে শাক ছয় রকমের—পত্র শাক যেমন পালং শাক, পুঁই শাক, কলমি শাক; পুষ্প শাক যেমন ফুলকপি, কলার মোচা, বকফুল, কুমড়োর ফুল; ফল শাক যেমন লাউ, কুমড়ো, বেগুন, পটল; নাল শাক যেমন লাউ-কুমড়োর লতা, কচুর লতি; কন্দ শাক যেমন আলু, ওল, কচু, মুলা; সংস্বেদজ শাক যেমন পাতাল কোঁড, মাশরুম ইত্যাদি।

আলুর আরো নানা রকম মানে আছে। আছে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োগ। আলু বাংলার বিশেষ বিশেষ শব্দের অন্ত্য অঙ্গ, সহজ ভাষায় পাছা। এ যেমন :দয়া+আলু= দয়ালু, ঈর্ষা+আলু= ঈর্ষালু। অনুরূপ :নিন্দালু, নিদ্রালু, ঝগড়ালু, মায়ালু, চোরালু, পোড়ালু। সবজিকে যদি প্রথম আলু ধরা হয়, তাহলে এই শব্দের শেষে বসা দ্বিতীয় আলুও ভালোমন্দ সবখানে চলে।

বাংলা ভাষায় কিছু শব্দ আছে, যেখানে আলু সামনে বসে। যেমন: আলুবোখারা, আলুপুরি, আলুভর্তা, আলুথালু, আলুনি। আলুনিতেও আলু লাগে। আলুনির সঙ্গে আলুর সম্পর্ক নেই, লবণের সম্পর্ক।

এত কিছুর পরও আলুর বদনামের শেষ নেই। আসলে, যে বেশি কাজ করে তার বদনামও বেশি হয়। আরো একটা আলু আছে, যে আলু পরের শব্দের সঙ্গে একটু ফাঁক রেখে বসে। এর নাম আলুর দোষ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, ‘আলুর দোষ’ অর্থ লাম্পট্য, চরিত্রদোষ। কারো চরিত্রে দোষ থাকলে তা আলুর ওপর গিয়ে পড়ে। অনেকে এটাকে পিঁয়াজের দোষও বলে। আলু-পেঁয়াজ এক হলে অবশ্য জম্পেশ আলুর দম হয়ে যায়!

সবাই আলু খায়, এজন্য সবার মধ্যে কমবেশি আলুর দোষ দেখা যায়। আলু দেখলে আলু চোখ মেলে তাকায়। আলু কি আসলে খুব খারাপ জিনিস? এজন্যই কি চিকিত্সকগণ আলু কম খেতে বলেন? নইলে বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, সর্বপ্রিয় আলুকে লাম্পট্যের কাতারে নিয়ে যাবে কেন? নষ্টামি করে মানুষ, আর দোষ হয় আলু বা পেঁয়াজের। এজন্যই তো তাদের এত দাম!

মানুষের আলুর দোষ থাকতে পারে, আলুর কিন্তু তেমন দোষ নেই। আলুকে বলা হয় ‘কিং অব দ্য ভেজিটেবলস’। এর রয়েছে নানাবিধ মুখরোচক ব্যবহার। ফলে খাদ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আর যে জিনিসের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা, সে জিনিসের দাম তো একটু বেশি হবেই!

আশার কথা হচ্ছে, চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজের দাম নিয়ে মানুষের মধ্যে তেমন কোনো ক্ষোভ নেই। এখন যুগ পালটেছে। এ যুগের ছেলেমেয়েরা চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ-তেল নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। তাদের কাছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হচ্ছে—স্মার্টফোন, পাওয়ারব্যাংক, পেন ড্রাইভ, রাউটার, ট্যাব, পামটপ, ব্লুটুথ স্পিকার, নেটফ্লিক্স ইত্যাদি। এখন ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটের যুগ। তার মোহতেই নতুন প্রজন্ম মেতে আছে। চাল-ডাল-আলু-পটল-পেঁয়াজ নিয়ে ভাবনা করার মতো হাড়-হাভাতের সংখ্যা দেশে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

আগে তরুণ-তরুণীরা ‘কৃষিজীবী,’ ‘মত্স্যজীবী,’ ‘শ্রমজীবী’ এসব শব্দের চর্চা করত। আর এখন তারা শুধু ‘সিক্সটিন জিবি,’ ‘থার্টিটু জিবি,’ সিক্সটি ফোর জিবি, হানড্রেট জিবি, থাউজেন্ড জিবি- এসব কপচায়। এখন স্মৃতিশক্তি আর তাদের মাথায় থাকে না, তা এখন ঐ স্মার্টফোনে ঢুকে পড়েছে। যত স্মৃতি সব সেখানে। স্মৃতির আবার পরিমাণও আছে। এই আধুনিক প্রজন্ম নিছক ডাল-ভাত নিয়ে বসে নেই। এরা এখন এআই অর্থাত্ আর্টিফিশিয়াল ইনটিলিজেন্স-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে লড়ছে।

এখানে এখন গ্রামের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। ভার্চুয়াল জগতে তারা ‘ইনস্টা’ নামের একটা গ্রাম তৈরি করেছে। সেখানেই তাদের বসবাস, আত্মপ্রদর্শনী। পৃথিবীর তাবত্ বই অর্থাত্ ‘বুক’ বিসর্জন দিয়ে তারা দিনরাত কেবল ‘ফেসবুক’ চর্চা করে। এরা কথা খুব কম বলে। ওদের লিপি আছে তবুও ওরা চিহ্ন বা ছবি দিয়ে কথা বলে, মনের ভাব প্রকাশ করে। যারা একটু আঁতেল, তারা আবার টুইটার নামে এক নতুন ‘আকাশ’ তৈরি করেছে। তারা সেখানে বিচরণ করে আর দিন-রাত সেখানে ‘টুইট,’ মানে, পাখিদের কিচিরমিচির চলে। তবে আমাদের চেনা কাকলিকূজনের মতো ঠিক নয়।

যারা বড়লোক, যারা ব্যবসা-বাণিজ্য-প্রশাসন-রাজনীতির মাথা, যারা দেশটা চালায়, সমাজকে, সমাজের হাবা-গোবা-গরিব-মূর্খদের নেতৃত্ব দেয়, তাদের এখন খাবারের কষ্টের চেয়ে খাবার হজম করার কষ্ট অনেক বেশি। তারা খেয়েদেয়ে এতটাই মোটা-পটকা হয়েছে যে, পয়সা খরচ করে আবার মেদ ঝরাতে জিম না কোথায় একটা যায়। তা ছাড়া তারা চাল-ডাল-আলু-পটল খুব একটা খায় না। তারা ফ্রায়েড চিকেন, ডায়েট ড্রিংকস, ওটস, ফ্লেক্স, রোল, বার্গার, পিত্জা নামের আজব সব জিনিস খায়! ফলে ডাল-পেঁয়াজ-আলু-চাল মিলল কি মিলল না, তাতে তাদের মোটেও মাথাব্যথা নেই! তাদের কাছে আলুর দাম বৃদ্ধি মানে নিছক আলুরই দোষ!

n লেখক :রম্যরচয়িতা