আত্মশক্তির উদ্বোধন

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ২১:২৬

আরশিনগর g বাহার উদ্দিন

রাতের বৃহস্পতি, শারদীয়ার পঞ্চমী। কলকাতার পূর্বদক্ষিণ থেকে গড়িয়াহাট, পার্কসার্কাস, পার্কস্ট্রিট হয়ে, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে স্মিমিত শহরের মধ্যস্থল ছুঁয়ে উত্তর দিকে ছুটছি। উত্সবের মুহূর্তে এ এক অভাবনীয় নিঃসঙ্গ নিশিযাপন। জনশূন্য রাস্তা, ম্লান আলো ঝিলমিল ঐতিহ্য। নিষ্প্রভ লহর। বারোয়ারি আর বনেদি বাড়ির বড় পুজো, ছোট পুজোর আড়ম্বরে অভূতপূর্ব সংযম, সংযমের স্বপ্রণোদিত উপাসনা। আরোপিত নয়, অনুশাসিত নয়, স্বতঃস্ফূর্ত। সামাজিক দায়বদ্ধতার আরেক নির্মেদ, সচেতন প্রচেষ্টা। এ প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রশাসন, আদালত ও বিভিন্ন হিতাকাঙ্ক্ষী মঞ্চের অভিপ্রায়। পুজোর উদ্যোক্তা আর উত্সবপ্রত্যাশী লাখ লাখ মানুষের এই আত্মসংবরণ অতিমারির সংকট আর গুজবতাড়িত আশঙ্কাকে যেভাবে নস্যাত্ করছে, যেভাবে গড়ে তুলছে দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ, তাতে আতঙ্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে জেগে থাকবার, বেঁচে থাকবার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। মহোত্সবের ইতিহাসে, বঙ্গীয় সমতটে এরকম ত্যাগ আর জীবনপ্রীতির দৃষ্টান্ত সম্ভবত বিরল, বিরলতম। বাংলাদেশেও লক্ষ্য করছি, উত্সবের আড়ম্বরে সুচিন্তিত সংযমের প্রত্যাশিত সাধনা। ৭৬-এর মন্বন্তর, দুই মহাযুদ্ধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের উত্তরকালে সর্বনাশা দুর্ভিক্ষের দিনগুলোতেও মানুষের এরকম সম্মিলিত সতর্কতা আর সচেতনতা দেখা যায়নি।

দুর্যোগ কিংবা অতিমারি মানুষকে ভয় দেখায়। জীবনকে, প্রাণচাঞ্চল্যকে থমকে দিতে চায়। এই সুযোগে, কল্যাণহীন সুচতুর রাষ্ট্র ভয়ের মানচিত্রে অযূত আতঙ্ক চাপিয়ে দিয়ে যাপনের সমস্ত সুস্থতা আর স্বতঃস্ফূর্ততাকে রুদ্ধ করে গোপনে বৈষম্যের দেওয়ালকে উঁচু করতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে। পুঁজি আর নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র এখানে হাত মেলায় একে অন্যের সঙ্গে। রাষ্ট্রের ধূর্ততা, মুনাফাবাজাদের শটতা সমাজ টের পেয়ে যায়। জীবনের স্বাভাবিকতাকে স্পর্শ করে সমাজের বহু মুখ, বহুস্বর সতর্কতার প্রশস্ত দরজা খুলে দেয় তখন। এই যে মানুষের মুখে মুখে মাস্ক; এই যে এক দেহ থেকে আরেক দেহের দূরত্ব যাপনের আয়োজন; এই যে ২০২০ সালে ৯ মাস জুড়ে ঈদ, মহরম, হজ, বর্ষবরণ এরকম যে কোনো উচ্চকিত সমারোহের মুহূর্তে সংযমিত, ঐক্যবদ্ধ আচরণ কীসের লক্ষণ? বেঁচে থাকার অনিঃশেষ ইচ্ছার, প্রতিটি মুহূর্তে জীবনকে জীবজগেক এবং প্রকৃতিকে ভালোবাসবার।

করোনাকালে আধুনিক বিশ্ব যে প্রতিস্পর্ধা, যে সতর্ক দুঃসাহস অর্জন করেছে, জীবনের প্রতি যে দুর্নিবার আকর্ষণের রূপান্তরিত চেহারা খাড়া হয়েছে, যেভাবে বিজ্ঞান ঋদ্ধ করেছে আমাদের বাঁচবার সব অনুশীলিত সাধনাকে, তা অদৃশ্যের নেতির ইঙ্গিতকে, কুসংস্কারকে নাকচ করে মানুষের আত্মশক্তিকে অসামান্য, তুলনারহিত উত্তরণে পৌঁছে দেবে। অতিমারির উত্তরকালে দুনিয়া তার সেরা ফসল উত্পাদন করবে। এই বিশ্বাসিত, প্রত্যায়িত গৌরব দূরে নয়। কণ্ঠনালীর আশেপাশে ঘুরছে তার পূর্বাভাস। মানুষের সচেতনতা, মস্তিষ্কের নিরন্তর দ্যুতি বিকিরণ, কুিসতের বিনাশে তার জেদ আর ঘোষিত অঙ্গীকার এক মানবের জন্ম দেবে, যা সভ্যতার রূপ আর রুচিকে আশা করি একই ছত্রতলে জড়ো করবে। রাষ্ট্রের ক্লীবতার, রাষ্ট্রের যন্ত্রময়তার, রাষ্ট্রের কল্যাণহীন, শুভ্রতাহীন ও আধিপত্যবাদী ক্ষুদ্রতার অবসান আসন্ন। মৃত্যুর আগ্রাসন দেখে মানুষ যতটা না শঙ্কিত, তার চেয়ে বহু বেশি ক্ষুব্ধ সংকটকালেও এক রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেক রাষ্ট্রের বৈরিতার মহড়ায়। এটাই রাষ্ট্রযন্ত্রের আত্মনাশের ইঙ্গিত। দল আর গোত্রীয় স্বার্থ এবং ক্ষমতামত্ততা যখন রাষ্ট্রকে অন্ধ করে দেয়, তখন সে দৈত্য হয়ে ওঠে। অন্ধকার সবসময় দৈত্যের পছন্দ। এরকম মুহূর্তে অন্ধকারকে ভেদ করে জনশক্তির আলো ঐক্যের ডাক দেয়। আজ যা কোথাও উচ্চারিত, কোথাও অব্যক্ত, ক্ষীণকণ্ঠ, তা অদূর ভবিষ্যতে দ্রোহরূপ ধারণ করে নয়া সভ্যতার জন্ম প্রস্তুতি শুরু করেছে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত, ভ্রষ্ট, ভণ্ডের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এখানে সে প্রবল সতর্ক এবং সংযম আর ধীশক্তি তার অবলম্বন। উসকানি, ষড়যন্ত্র আর গুজবকে উড়িয়ে দিয়ে যেমন দুর্যোগে, তেমনি উত্সবের আয়োজনে, দুই বাংলায়ও উজ্জ্বল উত্তরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। এটাই বাঙালির মুখ আর অভিমুখ।

আপদের সময় এখন। ভয়ে নয়, বিপদকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবরণ পড়েছে বঙ্গজন। কিন্তু তার ভেতরের জাগৃতি আর নির্মাণের স্বপ্ন এ আবরণে ঢাকা পড়েনি। তা লক্ষ্য করছি সংকটকালেও তার উত্পাদনের বুদ্ধিতে, উত্সবের সংযত উচ্চারণে, প্রতিমার সাজসজ্জায়, মণ্ডপের বাইরে ও ভেতরে। এটাই তার গাঢ় প্রতিস্পর্ধা আর প্রবল দুঃসাহসের অভিজ্ঞান নয় কি? যে হার মানতে জানে না, তাকে হারাবে কে? পুজো নিয়ে কুসন্ধির কুত্সা, গুজব, অতিমারির হামলা অতিক্রম করে জয় তার নিশ্চিত। শারদীয়ার বোল আর তালে বেজে উঠছে আত্ম-উন্মোচনের সচেতন পদধ্বনি।

n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা