বহুকাল আগের কথা। তখন এক টাকায় অনেক সদাইপাতি পাওয়া যেত। এক গাঁয়ে ছিল এক কলু। তেল বিক্রি তার ব্যবসা। সে একদিন হাঁটে চলেছে তেল বিক্রি করতে। দুটি মাটির কেঁড়েভর্তি তেল। একটি ধামার মধ্যে রেখে তুলে দিয়েছে এক মজুরের মাথায়। এজন্য মজুরকে দিতে হবে দু’আনা।
মজুর ভাবে, দু’আনার একআনা দিয়ে সে চাল-ডাল, মাছ-তরকারি, তেল-নুন কিনবে। বাকি একআনা দিয়ে কিনবে অনেকগুলো মুরগির বাচ্চা। একদিন বাচ্চাগুলো বড় হবে। ডিম দেবে। সেই ডিম বাজারে বিক্রি করে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। তারপর সেই টাকা দিয়ে কিনবে কয়েকটা ধাড়ি ছাগল। ছাগলের অনেকগুলো বাচ্চা হবে। বাচ্চাগুলো বড় বড় খাসি হবে। তখন বাজারে বিক্রি করলে অনেক টাকা আসবে। তা দিয়ে অনেকগুলো গাই কিনবে। গাইয়ের পেটে বাছুর হবে। সেসব বাছুর বড় হবে। সেগুলো বাজারে বিক্রি করে যে-টাকা পাবে, তা দিয়ে সে জমি কিনবে। বলদ আর লাঙল কিনবে। নিজের জমি নিজেই চাষ করবে। তখন মাত্র দু’আনার জন্য পরের বোঝা বইতে হবে না।
মজুরের স্বপ্নের ঘুড়ি আরো ওপরে উঠতে থাকে—জমি চাষ করে অনেক ফসল পাবে। সেই ফসল বিক্রিকরা টাকায় বিয়ে করবে। তার সন্তান হবে। আনন্দ-উল্লাসে ভরে উঠবে সারা বাড়ি। জৈষ্ঠ্যের সকালে খেয়েদেয়ে সে লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে যাবে। জমি চাষ করবে দুপুর পর্যন্ত। বাড়ি এসে দাওয়ায় বসতেই বউ পাখা দিয়ে বাতাস করবে। গুড়মুড়ি আর পানি খেতে দেবে। তখন ছোট ছেলেটা দৌড়ে এসে বলবে—বাবা, পাখি ধরে দাও। তখন সে হাত উঁচিয়ে ঘাড় নেড়ে বলবে—না বাবা, এখন না। আর কী আশ্চর্য! সে সত্যি সত্যি হাত উঁচিয়ে ঘাড় নাড়াতেই মাথা থেকে ধপ করে নিচে পড়ে যায় তেলের কেঁড়েসুদ্ধ ধামা। মাটির কেঁড়ে মুহূর্তে ভেঙে খানখান। আর সব তেল পড়ে যায় রাস্তায়। এতক্ষণে হুঁশ ফেরে মজুরের। তার এমন চমত্কার স্বপ্ন মাটিতে মিশে যেতে দেখে সে গড়ানো তেলের ওপর বারবার চাটি মারে আর নিজের কপালের দোষ দিতে থাকে।
এদিকে কলু তো রেগেমেগে কাঁই। দুই কেঁড়ে তেলে তার কম করে হলেও চারটে টাকা ঘরে আসত; ব্যাটা মজুর কি না তা মাটি করে দিল! কলু চেপে ধরে মজুরকে—ব্যাটা, চার টাকা না দিলে তোকে ছাড়ছিই না। তুই আমার তেল ফেলে দিয়েছিস। কলুর কথায় মজুরও খেপে যায়। সে বলে—তোমার এই তেল আমার কত টাকার ক্ষতি করেছে জানো? কলু তখন অবাক হয়ে বলে—তোমার তো ক্ষতি হয়েছে মাত্র দু’আনা। আর আমার? আমার যে গোটা চারটে টাকা জলে গেল...
—আর আমার যে হাজার হাজার টাকার স্বপ্ন মাটি হয়ে গেল, তার কী হবে?—এই বলে কলুর কাছে সে তার স্বপ্নের বিস্তারিত হিসেব দেয়। সব শুনে কলুর চোখ তো ছানাবড়া। সে ভাবে, তাই তো! তার না হয় মাত্র চার টাকার তেল নষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই মজুরের ক্ষতি তো আরো বেশি। তাই কলু তার গাঁট থেকে দুটি আনা বের করে মজুরকে দিয়ে বলে—যাও ভাই, তুমি তোমার স্বপ্ন পুরো করো গিয়ে।
মজুর দু’আনা হাতে নিয়ে কলুকে সালাম জানায়। তারপর হনহন করে ছুটে যায় বাজারের দিকে। মুরগির বাচ্চা কেনার মধ্য দিয়েই সে তার স্বপ্নের যাত্রা শুরু করতে চায়।
পুনর্কথন :মুস্তাফা মাসুদ
