মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধী সাজেদা খাতুনকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে ২৫ বছর ধরে। আর পিয়ারী খাতুনের শেকল বন্দি জীবন ৩৮ বছরের। সাজেদা, পিয়ারীর মতো তাড়াশ উপজেলার আরো কয়েক জন মানসিক প্রতিবন্ধী আবুল হোসেন, মোস্তাফিজ, মোজাম্মেল, সাজেদুল, শাহাদত ও ময়দান আলী। তাদের সকলের গল্পটা অনেকটাই একইরকম। পারিবারিক সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় চিকিত্সার অভাবে এদের সবাইকে কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে দরিদ্রতা যোগ হয়ে তাদের করে ফেলেছে জীবন্ত লাশ।
সঠিক চিকিত্সার ব্যবস্থা করা গেলে প্রতিবন্ধিতার মাত্রা কমে তারা অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতেন। শুধু প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের সামান্য টাকায় তাদের ভরণপোষণ সম্ভব নয়। এজন্য সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাজেদা, পিয়ারী, আবুল হোসেন, মোস্তাফিজ, মোজাম্মেল, সাজেদুল, শাহাদত ও ময়দান আলীর না আছে থাকার জায়গা, না আছে তিনবেলা খাবারের জোগাড়। মানসিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসেবা থেকে তারা বরাবরই বঞ্চিত। সঠিক চিকিত্সা না করিয়ে তাদের কারো পায়ে, কারো কোমরে লোহার শিকল বেঁধে পরিত্যক্ত ঘরে কিংবা রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হয়েছে।
মানসিক প্রতিবন্ধী সাজেদা খাতুনের (৩৭) মা জাবেদা খাতুন বলেন, সাজেদার অল্প বয়সেই বিয়ে হয়। আর বিয়ের পাঁচ-ছয় মাস পরেই প্রতিবন্ধিতা দেখা দেয়। তার স্বামী তাকে তালাক দেয়। তখন পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠে। হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার সময় নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার মরামর্শ দেন। অর্থাভাবে তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে পরিত্যক্ত ঘরের খুঁটির সঙ্গে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।
একই ইউনিয়নের জন্তিহার গ্রামের মৃত নওসের আলীর মেয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী পিয়ারী খাতুন (৫১) দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে শিকলে বাঁধা। পিয়ারীর ভাই আব্দুল খালেক বলেন, জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী না হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিয়ারীর মানসিক অসুস্থতা বাড়তে থাকে। সেই সময় তার চিকিত্সা না করিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। এতে অসুস্থতা আরো গুরুতর আকার ধারণ করে। স্বামীর সংসারে টিকতে না পেরে তাকে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়িতে। ছোট্ট একটি খুপরি ঘরে তার বসবাস। খালেক বলেন, সংসারে দিন আনি দিন খাই অবস্থা। তার মধ্যে বোনের ভরণপোষণে প্রতিমাসে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা গুণতে হয়। মাঝে একবার উপজেলা সমাজসেবা অফিসের সহায়তায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তবে নিয়মিত ওষুধ দিতে না পারায় অসুস্থতা বেড়ে যায়।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী আবুল হোসেনের (২২) মা হাফিজা খাতুন বলেন, জন্মগতভাবেই আবুল হোসেন বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার শিকার। ১০ বছর বয়স থেকেই তাকে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার বাবা ভূমিহীন। বাড়ির পাশে ক্ষুদ্র পরিসরে মুদি দোকান করে কোনোমতে দিনাতিপাত করেন।
মাধাইনগর ইউনিয়নের কাস্তা গ্রামের মানসিক প্রতিবন্ধী গোলাম মোস্তাফিজ (২৮) লোহার শিকলে বাঁধা পড়ে আছেন ১৩ বছর ধরে। তার বাবার নাম আনোয়ার হোসেন ও মায়ের নাম সবুরা খাতুন। মোস্তাফিজের বাবা-মা বলেন, তাদের ছেলে জন্মগত প্রতিবন্ধী নয়। ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত সুস্থই ছিল। পরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা করা হলেও সুস্থ হয়নি। কথা হয় মোস্তাফিজের সঙ্গে। তাকে ঘরের বাইরে আসার জন্য বহু চেষ্টা করে কোনো লাভ হয় না। বসে থাকতেই নাকি তার ভালো লাগে।
একই ইউনিয়নের গুরমা গ্রামের মৃত মুঞ্জিল হকের ছেলে মোজাম্মেল হোসেনও (৩৪) মানসিক প্রতিবন্ধী। তার মা মাজেদা বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী। ১০ ভাইবোনের মধ্যে মোজাম্মেল ছোট। ১৪ বছর সে শিকলে বাঁধা। মোজাম্মেলের মা মাজেদা খাতুন বলেন, মোজাম্মেলের ভাইবোনরাও তার খোঁজ রাখে না। স্ত্রী-সন্তান ছেড়ে চলে গেছে। তাকে সঠিক চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব হয়নি। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে মা-সন্তানের।
জন্মগতভাবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার শিকার সাজেদুল ইসলামকে (২২) ১২ বছরেরও অধিক সময় ধরে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। সে তাড়াশ পৌর এলাকার সোলাপাড়া গ্রামের আব্দুস সামাদের ছেলে। সাজেদুলের মা সাজেদা খাতুন বলেন, অর্থাভাবে উন্নত চিকিত্সা করানোর সুযোগ হয়নি। যতই দিন যাচ্ছে তার একমাত্র সন্তানের প্রতিবন্ধিতা আরো গুরুতর হচ্ছে।
মানসিক প্রতিবন্ধিতাজনিত প্রতিবন্ধী শাহাদত হোসেন (৪৯)। বাবার নাম মৃত রিয়াজ উদ্দিন। সে সগুনা ইউনিয়নের কুন্দইল গ্রামের বাসিন্দা। শাহাদতের চাচা মশিউর রহমান বলেন, দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় হলো শাহাদতের দুপায়ে লোহার শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিকিত্সাও করানো হয়নি।
তালম ইউনিয়নের গোন্তা গ্রামের ইজ্জত আলীর ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী ময়দান আলী (৫১) ৩২ বছর যাবত্ শিকলে বাঁধা রয়েছেন। তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। বড় বোন রেজাতন খাতুন দেখভাল করেন। রেজাতন বলেন, কোমরে লোহার শিকল বাঁধা অবস্থায় দীর্ঘদিন বসে থেকে তার ভাই আর দাঁড়াতে পারে না। থাকার জায়গার অভাবে তিনটি টিনের একটি ছোট খুপরি ঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে। বেড়াও নেই তার সেই ঘরে।
এদিকে স্থানীয় ‘পরিবর্তন’ নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিবন্ধী পুনর্বাসনকর্মী (সিএইচডিআরপি) রোকসানা খাতুন বলেন, মানসিক অসুস্থতা জনিত প্রতিবন্ধিতার শুরুতেই সঠিক চিকিত্সা করানো গেলে দ্রুত আরোগ্য লাভ সম্ভব। কিন্তু পরিবারের লোকজন অসুস্থতার কথা না ভেবে প্রতিবন্ধী মনে করে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। এতে অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা আরো বৃদ্ধি পায়। তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিত্সার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এ কে এম মনিরুজ্জামান বলেন, বুদ্ধি ও অসুস্থতাজনিত মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের বাইরে দাপ্তরিকভাবে তেমন কিছু করার খুব একটা সুযোগ নাই। সিরাজগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন মো. জাহিদুল ইসলাম মানসিক অসুস্থতা জনিত প্রতিবন্ধীদের পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও জানান ।
