চলচ্চিত্রে সুদিন আসবে কবে?

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ২২:৩১

বাংলা সিনেমার অবস্থা কেমন? এ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত সবারই জানা—ভালো নয়। দেশের সিনেমা হলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশে ১ হাজার ২০০ সিনেমা হলের মধ্যে এখন রয়েছে মাত্র ৬৬ থেকে ৭০টি। কোনো কোনো জেলাশহরে এখন আর সিনেমা হলই নেই। যে শহরে পাঁচটি ছিল, সেখানে এখন মাত্র একটি সিনেমা হল। এ পরিস্থিতির মধ্যে করোনা মহামারি যেন বাংলা সিনেমার বুকে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। এখন সরকার সিনেমা হল খুলে দিতে বললেও হলমালিকরা খুলছেন না। গত কয়েক মাসে যে ক্ষতি হয়েছে সেই ক্ষতিকে আর বাড়াতে চাইছেন না তারা।

হলমালিকরা বলছেন, ভালো সিনেমা না থাকলে সেসব হলে চালিয়ে আমাদের খরচ হবে কিন্তু কোনো লাভ হবে না। এ পরিস্থিতিতে হল খুলতে রাজি নন তারা। আর যেসব সিনেমা হল খুলেছে তারা পুরোনো সিনেমা চালাচ্ছেন। কিন্তু পুরোনো সিনেমা চালিয়ে এই করোনার সময়ে মানুষকে হলমুখী করা সম্ভব নয় বলেই মত তাদের।

অথচ কী রমরমা অবস্থাই না ছিল আমাদের চলচ্চিত্রের! বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী যুগের কথা বলতে গিয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেন। প্রথমত বললেন, নায়করাজ রাজ্জাক ভারতের হিন্দি, বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু চলচ্চিত্রকে বাংলাদেশের সিনেমা হল থেকে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) হটিয়ে দিয়েছিলেন। নির্মাণ, গল্প সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সিনেমার প্রতি দর্শকের আগ্রহ এতটাই ছিল যে, হিন্দি সিনেমা না চালিয়ে রাজ্জাকের সিনেমা চালানো হতো।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে- স্বনামধন্য পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন ৩১ বছর আগে রুবেলকে নিয়ে ‘লড়াকু’ সিনেমা বানিয়েছিলেন। সেটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রিমেক হয়েছিল। সেই পশ্চিবঙ্গ আজ কত এগিয়ে গেছে। শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ লোকবলের কারণে। আমরা তো সেই আগের জায়গাতেই আটকে আছি। সিনেমার উন্নতি হবে কী করে!

এদিকে সরকার করোনা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হলমালিকদের ৭০০ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে যা নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে নিতে পারবেন হলমালিকরা। প্রধানত হলগুলোর মানোন্নয়ন ও করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেই এ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এ প্রণোদনা নিতে আগ্রহী নন অনেক হলমালিক। তারা বলছেন, ভালো ছবি না থাকলে, ব্যবসা করতে না পারলে, এই ঋণ নিয়ে কী হবে বরং ঋণের বোঝা বাড়বে। সিনেমা হলগুলোর মানোন্নয়নে প্রণোদনা নিতে তখনই আমরা আগ্রহী হবো যখন ভালো মানের সিনেমা আসবে। ভালো মানের সিনেমা আনতে তারা হলিউড ও বলিউডের ছবি চালানোর অনুমতি দেওয়ার দাবি জানান। যখন সিনেমা চালিয়ে ভালো ব্যবসা হবে তখন আবার নতুন করে হল প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী হবেন ব্যবসায়ীরা। এখন এই ৭০টি হলকে প্রণোদনা দিয়ে লাভ নেই বরং ব্যবসা বাড়লে, সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, কম সুদে ঋণ দিলে সেটা কাজে আসবে।

করোনার প্রভাবে বিশ্বজুড়েই সিনেমার ব্যবসা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তবে, হলিউড, বলিউডসহ যেখানে ভালো সিনেমা নির্মিত হয় তারা নতুন সিনেমা বানিয়ে বসে আছেন। শুধু করোনাকালীন স্থবিরতার সময় তা রিলিজ করছেন না। বাংলাদেশে নতুন সিনেমা যা রয়েছে তা এই করোনাকালে রিলিজ করার ঝুঁকি নিচ্ছেন না ইনভেস্টররা। ফলে, বাংলাদেশে ডুবতে বসা সিনেমা করোনার প্রভাবে একেবারেই বিলীন হওয়ার পথে—বলছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।

একসময় ভারতীয় হিন্দি সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা বাংলাদেশের সিনেমার এই অবস্থা কেন হলো? এ প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত অনেকের সামনে। তারা বললেন, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাইতে এর দায় প্রধানত সরকারের। সময়ের প্রয়োজনে আধুনিক ফিল্ম নির্মাণের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই বাংলা সিনেমা আজ ধুঁকছে। তার পরও যে বাংলা সিনেমা টিকে আছে, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত দেখার অপেক্ষায় আজও অনেকে সিনেমা বানাচ্ছেন সেটা চলচ্চিত্রে নিবেদিতপাণ শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের কারণেই।

সবাই বলছেন, চলচ্চিত্র শুধু আর্ট নয় ইন্ডাস্ট্রিও। তাই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে হলে, এই শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হলে ক্রিকেট, ফুটবল এবং গার্মেন্টস খাতের মতোই পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। তা না হলে আকাশ সংস্কৃতি ও বিদেশি সিনেমার চাপে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ধ্বংস অনিবার্য।

দেশের অভিজাত সিনেমা হল মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বললেন, ভালো ছবি নেই, তাই সিনেমা হল খুলে দিতে বললেও আমরা খুলছি না। কারণ, খরচ করে সিনেমা চালিয়ে তা লাভের মুখ দেখছে না। তাই ভালো সিনেমা না এলে হল চালাবো না। আমাদের তো নিজেদের হল লোকসান হলে বন্ধ রাখতে পারছি, যারা ভাড়া নিয়ে হল চালায় তাদের পরিস্থিতি আরো খারাপ। তারা হল খুুলে চেষ্টা করছে ব্যবসা করার কিন্তু নিম্নমানের ছবি দিয়ে ব্যবসায় লাভ করা সম্ভব নয়। তিনি সরকারের কাছে বিদেশি ভালো মানের ছবি চালানোর অনুমতি দেওয়ার দাবি জানান। নওশাদ বলেন, মানুষ এখনো করোনাজনিত ভয় ও আতঙ্কে আছে। তাই হল খুললেই দর্শক আসবে—এমন নয়। আগামী বছরের জুন-জুলাই পর্যন্ত এমন অবস্থা চলতে পারে।

এ বিষয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি কাজী শোয়েব রশীদ বলেন, অনেক দিন ধরেই আইসিউতে থাকা সিনেমা হল করোনাকালে চলে গেছে লাইফ সাপোর্টে। তিনি বলেন, এখন নেটফ্লিক্স ও অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরমের কারণে সব ছবি ঘরে বসে সেল ফোনে দেখতে পাচ্ছে দর্শকরা। সেখানে বিদেশি ছবি প্রদর্শনের সুযোগ খুলে দেওয়া উচিত। তা না হলে, হল মালিকরা হল চালু রাখতে পারবেন না। কাজী শোয়েব রশীদ বলেন, বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে হলে বিদেশি জনপ্রিয় সিনেমা দেখানোর কোনো বিকল্প নেই। যারা বিদেশি সিনেমা আনার বিরোধিতা করছেন, তারা পরিচালক, তারা ইনভেস্টর নন। একটি সিনেমা ব্যবসা সফল না হলে পরিচালকের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু লাভ না হলে ইনভেস্টর ডোবে, আমরা হল মালিকরা তখন কর্মচারীদের বেতন দিতে পারি না।

অনেকের মতে, দেশে ভালো সিনেমার দর্শক আছে কিন্তু মানসম্পন্ন ছবির অভাবে দর্শকরা হলে আসছেন না। এর পাশাপাশি রয়েছে অশ্লীল ছবির দৌরাত্ম্য। শাকিব খানসহ হাতে গোনা দুই-একজন হিরো ছাড়া একটি সিনেমার লগ্নি তুলে আনার মতো কোনো শিল্পী বর্তমানে নেই। অথচ পাকিস্তান আমলে তো বটেই বাংলাদেশ হওয়ার পরেও বেশ কয়েক জন নায়ক-নায়িকা ছিলেন যারা একটি সিনেমাকে ব্যবসা সফল করার ক্ষমতা রাখতেন। কিন্তু এখন সেই ইন্ডাস্ট্রি একেবারেই ধসে গেছে। টিভিতে প্রচুর লগ্নি হচ্ছে, অনেক শিল্পী, কলাকুশলী টিভিতে নিজের ক্যারিয়ার গড়ছেন, কিন্তু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পী, কলাকুশলী, টেকনিশিয়ান আসছে না।

অথচ কী গৌরবময় যাত্রাই না শুরু হয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের। একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা এসে মোহিত করেছে দর্শকদের। ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পরে বাংলাদেশের হলগুলোতে ভারতীয় বাংলা সিনেমা দেখানো হতো। দেখানো হতো হিন্দি ও উর্দু সিনেমা। কিন্তু সেসব সিনেমা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকাশে। নায়ক হিসাবে আজিম, আনোয়ার হোসেন, রহমান, রাজ্জাক আর নায়িকা হিসাবে সুজাতা, রেশমা, সুমিতা দেবী, সুচন্দারা যেভাবে দর্শকদের বাংলা সিনেমার দিকে টেনে এনেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় ববিতা, শাবানা, সুচরিতা, নূতনের মতো নায়িকা। এসেছিলেন ফারুক, ওয়াসিম, জাভেদ, সোহেল রানা, জাফর ইকবাল, বুলবুল আহমেদ, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেলের মতো নায়করা। তারা প্রত্যেকেই একটি সিনেমাকে ব্যবসা সফল করার মতো দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। ৬০-এর দশক থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত বাংলা সিনেমার উত্তরণের কাল। বাংলা সিনেমা নিজের ভাষা অর্জনের পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রি হিসাবেও শক্ত অবস্থান তৈরি করছিল। কিন্তু এর পর থেকেই নিম্নগতি। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও হয়ে পড়ে ওয়ানম্যান নির্ভর। মান্না, সালমান শাহ এবং হালে শাকিব খান। নায়িকার ক্ষেত্রেও তাই। মৌসুমী, শাবনুর। বর্তমানে উঠে আসার দৌড়ে রয়েছেন এক ঝাঁক নতুন মুখ। কিন্তু আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত না হলে অন্ধকারেই ডুবে যাবে চলচ্চিত্র। আলোর রেখা ফুটবে না।