শান্তিতে থাকিও দয়ালু বন্ধু

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ২১:৪০

জীবনের ‘তরঙ্গ মিলায়ে যায়’। মিলাইয়া যাইতেই হয়। ইহাই জাগতিক নিয়ম; কিন্তু তাহার পরও কিছু কিছু মানুষের চলিয়া যাওয়াটা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তেমনই একজন মানুষ গতকাল শনিবার এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া চিরতরে ত্যাগ করিয়াছেন। তিনি সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তাহার ৮৫ বত্সরের জীবনটি ছিল দ্যুতিময়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনাল লতে প্রথম স্থান অর্জন করিয়া স্বর্ণপদক অর্জন করিয়াছিলেন। যখন লন্ডনে হিন্দু ল লইয়া ব্যারিস্টারি পড়িতে যান তখন তিন বত্সরের ব্যারিস্টারি কোর্স তিনি শেষ করিয়াছিলেন মাত্র দেড় বত্সরের মধ্যে। কলকাতায় বেকার হোস্টেলে যেই কক্ষে বঙ্গবন্ধু থাকিতেন তাহার পাশের কক্ষেই থাকিতেন রফিক-উল হক। ভারতের নাগরিকত্ব ছাড়িয়া তিনি পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালে তত্কালীন পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত তিনি কাজ করিয়াছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে নানা আইন প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়াছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কাজ করিয়াছেন জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহিতও।

আমরা দেখিয়াছি, অঢেল অর্থের মালিক না হওয়া সত্ত্বেও অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে তিনি কোনো বেতন লইতেন না। তাহার কর্মপ্রাঙ্গণ সুপ্রিম কোর্ট বা বার অ্যাসোসিয়েশনের রাজনীতির সহিত তিনি কখনো জড়িত হন নাই। বলা যায় ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি দূরে থাকিয়াছেন। ফলে যে কোনো রাজনৈতিক দলের লোকই আইনি সমস্যা লইয়া তাহার দ্বারস্থ হইতে পারিতেন। তিনি ছিলেন সকল মত ও পথের ভরসাস্থল। ইহারই চরম দৃষ্টান্ত আমরা দেখিতে পাই এক-এগারো পরবর্তী আইনি ঘটনাক্রমে। সেই সময় জেলবন্দি দুই শীর্ষনেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার জন্য তিনি যুগপত্ আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। ইহাকে বলা যায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র উদ্ধারের সবচাইতে উজ্জ্বল ঘটনা। সেইখানে তিনি আক্ষরিক অর্থেই মহানায়ক। তাহার বয়স ৮০ বত্সর পার হইবার পরও বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও যে কোনো মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি বিস্তর পড়ালেখা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন। কাজে ছিলেন নিষ্ঠাবান।

রফিক নামের অর্থ বন্ধু, দয়ালু। তিনি সর্বান্তকরণে তাহার প্রকাশ ঘটাইয়াছেন। যেইখানে সুযোগ পাইয়াছেন, সেইখানেই তিনি বাড়াইয়া দিয়াছেন তাহার অপূর্ব সুন্দর মানবিক হাত। তাহার পিতা মুমিন-উল হক পেশায় ডাক্তার হইলেও তিনি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ডাক্তারি, জমিদারি ছাড়িয়া তাহার পিতা গণমানুষের জন্য রাজনীতি করিতে গিয়া নিঃস্ব হইয়া গিয়াছিলেন। আমরা বিপুল বিস্ময়ে দেখিয়াছি, পিতার দানবীর আদর্শ ব্যারিস্টার রফিকও অন্তরে গভীরভাবে লালন করিতেন। তাহার মতো নক্ষত্রতুল্য আইনজীবীর অর্থবিত্তের মালিক হইবার সুযোগ থাকিলেও বস্তুগত বিষয়ে কখনোই খুব অধিক আগ্রহী ছিলেন না রফিক-উল। নিজের ও স্ত্রীর উপার্জিত প্রায় সকল অর্থ তিনি মানবসেবায় দান করিয়া দিয়াছেন। ঢাকায় শিশু হাসপাতাল ছাড়াও সুবর্ণ ক্লিনিক, আদ-দ্বীন, বারডেম, আহসানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতালসহ অনেক চিকিত্সাধর্মী প্রতিষ্ঠানের সহিত জড়াইয়া ছিলেন তিনি। নিজের উপার্জিত অর্থে গাজীপুরের চন্দ্রায় ১০০ শয্যার সুবর্ণ-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। ইহা ছাড়াও ২৫টির অধিক হাসপাতাল, এতিমখানা, মসজিদ ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করিয়াছেন।

তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তবে নির্ভীকতা এবং মানবতার যেই অপূর্ব তরঙ্গ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আমাদের নশ্বর জগতে ছড়াইয়া গিয়াছেন, তাহা মিলাইবে না সহজে। আমরা তাহার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করিতেছি।