নিভে গেল আইনের বাতিঘর

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ২৩:১৬

এক বর্ণাঢ্যময় জীবন পেছনে রেখে চলে গেলেন আইনের বাতিঘর দেশের অন্যতম সেরা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তার মৃত্যুতে আইন ও বিচারাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আইন অঙ্গনের এই দিকপাল বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নিয়ে রাজধানীর আদদ্বীন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থাকাবস্থায় গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন) । মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

তিন দফা জানাজা শেষে বেলা সোয়া ৩টায় বনানী কবরস্থানে স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আইন পেশা শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, তা দিয়ে যে সমাজে বিশাল অবদান রাখা যায় তার নজির রেখে গেছেন আইন অঙ্গনের এই নক্ষত্র।

ব্যারিস্টার রফিক বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন। তিনি একাধারে দেশের প্রধান চারটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদ জিয়া, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এবং জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপির আইনজীবী ছিলেন। রাজনীতি এবং দেশ সচেতন ব্যারিস্টার রফিক একজন অরাজনৈতিক এবং দল নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসাবে আইনপেশায় ছয় দশক নিয়োজিত ছিলেন।

ব্যারিস্টার রফিক আইন পেশা থেকে উপার্জিত অর্থের সবই ব্যয় করছেনে সমাজসেবায়। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই মানবতার সেবায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। দানবীর ও সমাজসেবক হিসাবে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতাল, আহছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল, গাজীপুরের চন্দ্রায় স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন           ডা. ফরিদা হক মেমোরিয়াল হাসপাতাল, আদদ্বীন হাসপাতালসহ অসংখ্য দাতব্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজ্ঞ সংবিধানের ত্রয়োদশ, ষোড়শ সংশোধনী মামলাসহ অসংখ্য সাংবিধানিক মামলায় অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ আইনি মতামত দিয়েছেন। ছিলেন কোম্পানি আইনের একজন দিকপাল। বাংলাদেশ ব্যাংকিং আইন সংস্কারে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডিনেন্স, প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন জাতীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা রেখে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন ব্যারিস্টার রফিক। দেশের রাজনৈতিক সংকটের সময়ে আইনজীবী হিসেবে তার অবদান দলমতনির্বিশেষে সবার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ, ঘুষ-দুুর্নীতি বন্ধে তিনি সবসময় ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।

প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। বিবৃতিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বিপুল অবদান রেখেছেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ আইনবিদকে হারাল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সংবিধান সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। একটি মিথ্যা মামলায় তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে তাকে গ্রেফতার করার পর জেল থেকে মুক্তির জন্য আইনি লড়াইয়ে এগিয়ে আসায় ব্যারিস্টার রফিকের ভূমিকার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নিয়ে গত ১৫ অক্টোবর আদদ্বীন হাসপাতালে ভর্তি হন ব্যারিস্টার রফিক। প্রথম দিকে তাকে কেবিনে রেখে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবস্থা কিছুটা জটিল হওয়ায় তাকে হাই ডিপেনডেন্সি কেয়ার ইউনিটে (এইচডিইউ) ভর্তি করা হয়। গত ২০ অক্টোবর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ঐ সময় তার ব্লাড প্রেশার ও অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যায়। এতে তিনি শকে চলে যান। পাঁচ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকাবস্থায় তিনি গতকাল ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিম উল হকসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। ব্যারিস্টার ফাহিম পরিবারসহ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।

মৃত্যুর পর মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা সকাল সাড়ে ১০টায় আদদ্বীন হাসপাতালের মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে বেলা ১১টায় তার মরদেহ নেওয়া হয় পুরানা পল্টনের নিজ বাসভবন ‘সুবর্ণ’তে। প্রথিতযশা এই আইনজীবীকে শেষ বারের মতো দেখার জন্য সেখানে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও আইনজীবীরা। যান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। সোয়া ঘণ্টা বাসভবনে রাখার পর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। সেখানে বাদ জোহর মরহুমের দ্বিতীয় দফা নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বস্তরের মানুষ তাতে অংশ নেন। দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে রফিক-উল হকের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রিয় কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্টে যেখানে তিনি অতিবাহিত করেছেন কর্মজীবনের ৬০টি বছর। অসংখ্য সাংবিধানিক ও দেওয়ানি মামলায় অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে আদালতে দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ আইনি মতামত। বেলা ২টায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে মরহুমের তৃতীয় দফা নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন, ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, জাতীয় পার্টি-জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাদেক সিদ্দিকীসহ কয়েকশ আইনজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

জানাজা শুরুর আগে পরিবারের পক্ষে রফিক-উল হকের বড় ভাইয়ের ছেলে মিসবাউল হক তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, আমার চাচা যদি কারো মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকেন তাকে ক্ষমা করে দেবেন।

জানাজা শেষে মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা জানান তাদের সামরিক সচিবগণ, প্রধান বিচারপতিসহ আপিল ও হাইকোর্টের বিচারপতিগণ, মন্ত্রিবর্গ, ডিএসসিসি মেয়র। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকেও কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিসহ নেতৃবৃন্দ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানে বেলা সোয়া ৩টায় শোকাবহ পরিবেশে স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

যারা শোক জানিয়েছেন

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে উনি আদালতকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য রফিক-উল হক নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ,  মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম  রেজাউল করিম, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ড. মুরাদ হাসান, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন।

জীবনবৃত্তান্ত

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মরহুম মমিনুল হক, মাতা নূরজাহান বেগম। ব্যারি স্টার রফিক ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৬০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসাবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৬১ সালে ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী লিংকন ইন থেকে হিন্দু আইনের ওপর বার এট ল ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু আইন পাঠ্য হয়।

১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে যোগ দেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সিনিয়র হিসাবে তালিকাভুক্ত হন ১৯৭৫ সালে। বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে নিযুক্ত হন ১৯৯০ সালে। কিন্তু নেননি কোনো সম্মানি। বর্ণাঢ্য  জীবনে আইন পেশায় অতিবাহিত করেছেন দীর্ঘ ৬০ বছর। বিগত ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যখন কারাগারে তখন তাদের জন্য অকুতোভয় আইনি লড়াই করে তাদের মুক্ত করেন তিনি। গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “নিজেকে একটু ব্যর্থ মনে হয় দুই নেত্রীকে একসঙ্গে বসাতে না পারায়।”

ব্যারিস্টার রফিকের স্ত্রী ডা. ফরিদা হক ২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। রফিক-উল হক অবসরে বই পড়তেন। পছন্দ করতেন ক্রিকেট খেলা। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা পুরষ্কার লাভ করেন। জীবনে যা চেয়েছেন তার চেয়ে বেশিই পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন অগণিত মানুষের ভালোবাসা।