ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদন একপেশে এবং পক্ষপাতমূলক

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১৮:১৫

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান তাঁর বিরুদ্ধ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘একপেশে’ এবং ‘পক্ষপাতমূলক’ আখ্যায়িত করে আনীত অভিযোগসমুহ প্রমাণের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। রবিবার (২৫ অক্টোবর) বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ সিনেট ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান। এ বিষয়ে তিনি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তনয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

রাবি উপাচার্য বলেন, ‘আমি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম যেমন- ঢাকাস্থ অতিথি ভবন ক্রয়ে ১৩ কোটি টাকা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে হেকেপ প্রকল্পের সাড়ে তিন কোটি টাকা এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক নির্মাণে ৮০ লক্ষ টাকা তছরুপের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সিন্ডিকেট কর্তৃক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এরপরই বর্ণিত অপকর্মে সংশ্লিষ্টরা আমার বিরুদ্ধে নিরন্তর অসত্য, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ এবং পত্র-পত্রিকাসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে।’ 

তিনি বলেন, ‘আসলে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ নামধারী কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ শিক্ষক নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার নিমিত্তেই সরকার ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের যোগসাজশে আমার বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগসমূহ উত্থাপন করে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়কে অশান্ত ও অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, অন্যদিকে সরকারকেও বিব্রত করছে। এরাই মূলত: ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অথরিটির নির্বাচনে জামাত-বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করে।’

অধ্যাপক আব্দুস সোবহান বলেন, ‘ইউজিসি গঠিত তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, সেটা সম্পর্কে উপাচার্য হিসেবে আমি অবহিত নই। তবে ইউজিসি’র তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরগুলো জনমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি-বিধান সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য দেশের মানুষ ও সরকারের কাছে আমার অবস্থান স্পষ্ট করার অনুভব করছি।’

উপাচার্য বলেন, ‘যেকোনো আমলযোগ্য অভিযোগের তদন্ত বাঞ্ছনীয়। আমি তদন্তের বিরুদ্ধে নই। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহের যথাযথ তদন্ত হলে আমার একশতভাগ সম্মতি আছে। তবে সেই তদন্ত হতে হবে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে। আইনসিদ্ধ ভাবে গঠিত পক্ষপাতহীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে। এই বিষয়ে আমি গত ৯ সেপ্টেম্বর ইউজিসির চেয়ারম্যানকে পত্র দিয়ে জানিয়েছি। আশা করেছিলাম সেইপত্র বিবেচনায় চেয়ারম্যান পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কিন্তু তা বাস্তবে ঘটেনি। বরং মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বলাবাহুল্য প্রতিবেদনটি একপেশে এবং পক্ষপাতমূলক। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ প্রমাণের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’

শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৮৫ ও ১৯৯২ সালের নীতিমালায় ২০১২ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত নিয়োগ চালু ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গ্রেডিং পদ্ধতি প্রবর্তন হওয়ায় সনাতন পদ্ধতির সাথে গ্রেডিং পদ্ধতিতে প্রাপ্ত জিপিএ সংযোজনপূর্বক ২০১২ সালের ১০ মে সিন্ডিকেটে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুমোদিত হয়। সাবেক উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দীন দায়িত্ব গ্রহণের পর এ নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু পরে তিনিই ২০১৪ সালে তার কন্যার এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএ-কে ভিত্তি ধরে শুধুমাত্র ইংরেজি বিভাগের নিয়োগের যোগ্যতা পুন নির্ধারণ করেন। তাঁর কন্যার নিয়োগ ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর চূড়ান্তের মাত্র ১০ দিনের মাথায় ২১ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে সিন্ডিকেটে সকল বিভাগ/ইনস্টিটিউটের জন্য অতি উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন নিয়োগ নীতিমালা অনুমোদন করেন। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজটি করা হয়েছে।’

অধ্যাপক আব্দুস সোবহান বলেন, ‘সাবেক উপাচার্য প্রণীত শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অতি উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়ায় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার জন্য প্রশাসনকে লিখিত অনুরোধ করে। তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পুনরায় নির্ধারণের জন্য ২০১৭ সালে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহার নেতৃত্বে অনুষদের অধিকর্তা, সিন্ডিকেট সদস্য ও শিক্ষক সমিতির সভাপতিসহ ৭ সদস্যের যাচাই বাছাই কমিটি গঠন করা হয়।

ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে শিক্ষক নিয়োগের নতুন নীতিমালা প্রণীত হয়। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন। আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে রায় দিয়ে এই নীতিমালা যথাযথ অনুসরণের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।’

নিজের মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিতে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করা হয়নি উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘২০১৭ সালের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ২৪টি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে কয়টি বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও নীতিমালা সম্পর্কে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও শিক্ষক সমিতির অনুরোধের প্রেক্ষিতে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

সে নিয়োগ নীতিমালাকে জামাই ও মেয়েকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া যদি ইউজিসি তদন্ত কমিটি এমন মন্তব্য করে থাকে তাহলে সেই তদন্ত পক্ষপাতহীন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে লিখিতভাবে আমার মতামত জানতে চাইলে, নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়নের সামগ্রিক প্রক্রিয়া সবিস্তারে তথ্য প্রমাণসহ আমি সশরীরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে দাখিল করেছি। কিন্তু প্রকাশিত খবরের ভাষা সঠিক হলে অনুমান করা যায় যে, তদন্ত কমিটি আমার দাখিলকৃত তথ্য প্রমাণাদি আমলে নেয়নি।’   

উপাচার্য বলেন, কোন কোন গণমাধ্যম তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বোর্ড যে প্রার্থীদের ক্লাস নেয়ার পারদর্শিতা  ডেমো) বাছাই করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে জানাতে চাই যে, রাজশাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ডেমো বা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে প্রদর্শনীর আয়োজনের রেওয়াজ নেই। নিয়োগবোর্ড কেবলমাত্র আবেদনের যোগ্যতাসম্পন্ন উপস্থিত প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সকল যোগ্যতা বাছাই করে থাকে। 

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এমএ বারী, প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান, জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমানসহ হল প্রাধ্যক্ষ, বিভাগীয় প্রধান ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

ইত্তেফাক/এসআই