প্রজাপতিদের মতোই ফুলে ফুলে পরাগ ছড়াতে চৌকস মৌমাছিরা। তবে জাতের দিক দিয়ে দুয়ের মধ্যে তফাত যথেষ্ট। জাতি হিসেবে এরা পিঁপড়েদের জ্ঞাতিভাই। মৌমাছিরা বনের ছায়াঢাকা গাছের ডালে, কখনো বড় গাছের ফোকরে, ঘরের কার্নিসে বা বারান্দায় চাক বাঁধে—আর তাতে মধু জমিয়ে রাখে। মধু অবশ্য জমায় তারা তাদের বাচ্চাদের খাওয়াবার জন্যে; মানুষ তাদের সেই মিষ্টি মধুর ভাঁড়ারে ভাগ বসায়।
অন্য কীটপতঙ্গদের মতো মৌমাছিদের শরীরেও তিনটে অংশ; আর ডানা রয়েছে দুজোড়া। প্রতিটি চাকে মৌমাছি থাকে তিন ধরনের। চাকের একটা মৌমাছি হলো বেশ বড়সড় আর লম্বাটে আকারের—একে বলা হয় রানি মৌমাছি। রানির একমাত্র কাজ ডিম পাড়া; এছাড়া সে আর কোনো কাজ করে না। আসলে সে হলো চাকের সব মৌমাছির মা। এছাড়া চাকে থাকে কয়েক শ পুরুষ মৌমাছি আর কয়েক হাজার কর্মী মৌমাছি।
কর্মীদের পেছনের দু পায়ে একটা করে খাঁজ আছে—ফুল থেকে পরাগ পুঁটলি করে এই খাঁজে জমিয়ে এরা বাসায় আনে। ফুলের মিষ্টি রস আর পরাগ হলো মৌমাছিদের খাবার। মিষ্টি রসকে মধুতে পরিণত করে এরা চাকে জমিয়ে রাখে। চাকের কোনো কোনো খোপে থাকে পরাগ।
কর্মীরা আসলে মেয়ে মৌমাছি, তবে তারা ডিম পাড়ে না। মোম দিয়ে চাক বানানো, ফুল থেকে মিষ্টি রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে মধু তৈরি, রানির ডিম থেকে জন্মানো বাচ্চার দেখাশোনা—এসব কাজ কর্মীরাই করে। পুরুষরা আলসের হদ্দ; সময়মতো রানীকে সঙ্গ দেয়া ছাড়া তারা আর কিছুই করে না—এমনকি তাদের খাবার খাইয়ে দেয় কর্মীরাই।
মৌমাছির চাক যেন বিরাট একটি শহর। এক একটা চাকে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার থেকে লাখ খানেক মৌমাছি থাকতে পারে। চাকের দেখাশোনার জন্যে কর্মীদের মধ্যে আছে ঝাড়ুদার, আয়া, শান্ত্রী। তাছাড়া ঘর তৈরি আর ফুলের মিষ্টি রস বা রেণু সংগ্রহ—এসব কাজ করার জন্যে আছে আলাদা আলাদা কর্মীদল।
মৌমাছির চাকের খোপগুলো সব ছয় দেয়ালের। এগুলো তৈরি হয় কর্মী মৌমাছিদের পেটের ভাঁজের একরকম গ্রন্থি থেকে বেরনো মোম দিয়ে। আশ্চর্য কৌশলে মৌমাছিরা খোপগুলো সারবেঁধে আর হুবহু একই ধাঁচে তৈরি করে। খোপগুলো এমনভাবে তৈরি হয় যাতে খুব কম মোম খরচ করে তাতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ মধু জমিয়ে রাখা যায়। কর্মী জাতের বাচ্চার জন্যে যে মাপের খোপ তৈরি হয় পুরুষ জাতের বাচ্চার খোপ হয় তার চেয়ে একটু বড়। রানির জন্যে একটা কুঠরি তৈরি করা হয় বেশ বড় মাপের।
সূত্র : কীটপতঙ্গের বিচিত্র জগত্/আবদুল্লাহ আল-মুতী
