সমকালীন শস্যের দেবী

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩৭

 

শ্রী শ্রী চণ্ডীর একাদশ অধ্যায়ে একটি শ্লোকে আছে—হে দেবগণ, এই সময় আমি নিজের শরীর দিয়ে উত্পন্ন হওয়া প্রাণধারক শাকপাতা দ্বারা সহস্র জগতের ভরণপোষণ করব। যতদিন পর্যন্ত বৃষ্টি না হবে, ততদিন পর্যন্ত ঐ শাকই সমস্ত প্রাণীকে রক্ষা করবে। এই কাজের জন্য আমি পৃথিবীতে ‘শাকম্ভরী’ নামে পরিচিত হব। শাকম্ভরী অর্থাত্ ধরিত্রীর বুকে যিনি সবুজ সবজি ফলান। ঐ অবতারের রূপেই আমি ‘দুর্গম’ নামে মহাসুরকে বধ করে ‘দুর্গা’ নামে জগদ্বিখ্যাত হব।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এভাবেই তিনি শস্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে বীজ বপনের লগ্নে পূজিত হন। দেবীর শাকম্ভরী মূর্তি হলো তারই প্রতীক এবং লৌকিক দেবীরূপে আদিম জনগোষ্ঠীর কাছে সাক্ষাত্ মাতৃস্বরূপা। তাঁর উর্বরতাজনিত সম্বন্ধের কারণেই দেখা যায় দুর্গাপূজার সপ্তমীতে নবপত্রিকার আবির্ভাব ও আবাহন। এখানে নবপত্রিকারূপী ন’টি গাছকে কল্পনা করে নজন দেবীর আরাধনা করা হয়। কলাগাছ—ব্রহ্মণী; কচুগাছ—কালিকা; হলুদগাছ—দুর্গা; জয়ন্তীগাছ—কার্তিকী; বেলগাছ—শিবা; ডালিমগাছ— রক্তদন্তিকা; অশোকগাছ—শোকরহিতা; মানকচু—চামুণ্ডা; ধানগাছ—লক্ষ্মী। আর ন’টি জলপূর্ণ ঘটে অষ্টমীর দিনে দেবীর নবশক্তি কল্পিত হয়।

হিন্দুধর্ম বিস্তারের ফলে বিশেষত তান্ত্রিক আচারের প্রভাবে ধরিত্রীকে নানা দেবীর রূপে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। তাঁর বিভিন্ন রূপ, যেমন—দুর্গা, কালী এবং লক্ষ্মী, এঁরা কোনো না কোনো ভাবে ধরিত্রীকে বোঝায়। দুর্গার মূর্তি পূজায় যেমন বিভিন্ন আদিম জনগোষ্ঠীর সঙ্ঘবদ্ধতা লক্ষ করা যায়, তেমনি তাদের বিভিন্ন কূলপ্রতীক বা টোটেম—পশুপাখি, গাছপালা, সিংহ, হাতি, সাপ, পেঁচা, হাঁস, ইঁদুর, ময়ূর, পদ্ম, ধানের শিষ, নবপত্রিকা প্রভৃতিও লক্ষণীয়।

বাংলার লোকসংস্কৃতি গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ধরিত্রী নানা দেবীর রূপে বাংলাদেশে পূজিত হয়ে থাকেন। এই পূজার আদিমতম রূপ ছিল মৃত্তিকাস্তূপের সামনে অর্ঘ্য নিবেদন করে পূজা করা। আদিবাসী অঞ্চলে এখনো পুজার এই রীতি প্রচলিত আছে।

লিয়াকত হোসেন খোকন