শেষ বলিয়া কিছু নাই

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩৮

ইসরাইলের সহিত সম্পর্ক স্বাভাবিক করিতেছে সুদান। ইহার বিনিময়ে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের তালিকা হইতে সুদানের নাম বাদ দিতেছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা যায়, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এখন অবধি পাঁচটি আরব রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করিল। গত শুক্রবার এই দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করিবার চুক্তির ঘোষণা দিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলিয়াছেন—কমপক্ষে আরো পাঁচটি আরব দেশ ইসরাইলের সহিত শান্তিচুক্তি করিতে চাহে! ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যথারীতি বলিয়াছেন—এই চুক্তিটি ‘নূতন যুগ’-এর সূচনা করিবে এবং শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ায় ইহা একটি ‘নাটকীয় অগ্রগতি’। নাটকীয়ই বটে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণ ইহাতে সম্ভবত খুব বেশি বিস্মিত হইতেছেন না। যুক্তরাষ্ট্রে এখন আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের উত্তাপ ছড়াইতেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ইহুদি লবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্টই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়াছেন। ইসরাইলকে যাহাতে আরব লীগ অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহ ক্রমান্বয়ে স্বীকৃতি দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমেই তাহার চেষ্টা চলিতেছে বহু বত্সর ধরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ইহুদি লবির সমর্থন আদায়ের কাজটি ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করিয়া পূর্বেই কিছুটা সম্পন্ন করিয়া রাখিয়াছিলেন। এখন বাহরাইন ও আমিরাতের পর সুদানকে ইসরাইলের সহিত কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করিয়া বিষয়টিকে আরো শক্তপোক্ত করিয়া রাখিলেন বলিয়া অনেকে মনে করেন। ইতিমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলিয়াছেন—তিনি আশা করেন যে, ইসরাইলের সহিত সৌদি আরবও সম্পর্ক স্বাভাবিক করিবে।

আমরা স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি, ফিলিস্তিনের ভাগ্যাকাশে ঘনকৃষ্ণ আঁধার জমিতেছে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনির জন্য ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধান’ এখন বহুলাংশেই অন্ধগলিতে পথ খুঁজিয়া মরিতেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, টু স্টেট সলিউশনের পরিবর্তে ‘ওয়ান স্টেট’ সলিউশনই এখন ‘ডি ফ্যাক্টো’ হইয়া দাঁড়াইতেছে। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি, সুদান, বাহরাইন ও আমিরাতের পূর্বে ইসরাইলের সহিত সম্পর্ক স্বাভাবিক করিয়াছে মিশর ও জর্দান। দুঃখের সহিত বলিতেই হয়, বহু বত্সর ধরিয়া মৃত্যু উপত্যকা ফিলিস্তিনে ‘সবার ওপরে যুদ্ধ সত্য’—অবস্থা সৃষ্টি করিয়াছে ইসরাইল। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হইতেই স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর দেশটির সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয়। তবে অনেক রক্তনদী সৃষ্টি হইলেও আজও ফিলিস্তিনের সেই স্বপ্ন পূরণ হয় নাই। আর তাহা পূরণ না করিতে যাহা যাহা করা দরকার, যেই সকল কৌশল অর্জন করা দরকার—তাহার সকল কিছুই করিয়া যাইতেছে ইসরাইল। ১১ কোটি ফিলিস্তিনির প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কোনো রকমে গাজা ভূখণ্ডে এবং পশ্চিম তীরে বসবাস করিতে পারিতেছে, বাকিরা উদ্বাস্তু হইয়া আশ্রয় লইয়াছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হইল—ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা চিরকাল কি অধরাই থাকিয়া যাইবে? ফিলিস্তিনিরা অবশ্য ‘বাংলাদেশ’-এর স্বাধীনতার ইতিহাস হইতে কিছুটা সান্ত্বনা পাইতে পারে। কারণ, ১৯৭১ সালে একমাত্র ভারত ও রাশিয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের বৃহত্ পরাশক্তিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষেই ছিল; কিন্তু তাহার পরও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঐ বৃহত্ পরাশক্তিরাও দাবাইয়া রাখিতে পারে নাই। যদিও, প্রতিটি স্বাধীনতাকামী ভূখণ্ডের জন্যই উহার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সময় ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন হইয়া থাকে। তবে সেই ভিন্নতার ভিতরেই ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যতে তাহাদের স্বাধীনতার পথ তৈরি করিতেই পারে। কথায় আছে—শেষ বলিয়া কিছু নাই।