নিজামুল হক
করোনার প্রভাবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো স্থায়ীভাবেই বন্ধের পথে! এসব স্কুলের টিউশন আদায়ের হার প্রায় শূন্য। বেতন-ভাতা বন্ধ শিক্ষক-কর্মচারীদের। ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৫ হাজার স্কুল। আগামী বছরের শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুললে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে আরো ২৫ হাজার স্কুল। এতে চাকরি হারাবেন অন্তত ৫ লাখ শিক্ষক।
কিন্ডারগার্টেনের মালিকরা বলছেন, করোনায় ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর কিন্ডারগার্টেনগুলোও বন্ধ রাখা হয়। আর তখন থেকেই অভিভাবকরা নিয়মিত টিউশন ফি পরিশোধ করছেন না। ফলে ৯৯ শতাংশ ভাড়াবাড়িতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। পারছে না বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে। আয় না থাকায় ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে। আবার বেতন না পেয়ে শিক্ষকরাও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক শিক্ষক চলে গেছেন অন্য পেশায়। অভিভাবকদের কাছে টিউশন ফি চাইলে দিচ্ছেন না এবং আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় কেউ কেউ দিতে পারছেন না।
উদ্যোক্তারা বলছেন, স্কুল খুললে অনেক শিক্ষার্থীও হয়তো কিন্ডারগার্টেনে ফিরবে না। অনেক উদ্যোক্তাও গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন বা যাচ্ছেন। শিক্ষকেরাও চলে যাচ্ছেন, পেশা বদলাচ্ছেন। হবিগঞ্জের একজন শিক্ষক চা-কফি বিক্রি করছেন। দিনাজপুরের একজন শিক্ষক রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের একজন শিক্ষক নৌকা চালাচ্ছেন—এমন হাজারো উদাহরণ জমা হয়েছে কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তরে।
কিন্ডারগার্টেনের উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনার কারণে দেশে অন্তত ৫ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আগামী জানুয়ারিতে স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত না এলে আরো ২৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে যাবে। আর মার্চের মধ্যে না খুললে অস্তিত্ব হারাবে এই কিন্ডারগার্টেনগুলো।
বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, এভাবে আর চলছে না। ৯৯ শতাংশ বাসাবাড়িতে চলছিল কিন্ডারগার্টেন। এখন দুরবস্থা চলছে। অনেকে প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিলেও প্রকাশ করতে পারছে না। তিনি বলেন, শোনা যাচ্ছে মার্চের আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে না। যদি তাই হয়, তাহলে বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেনের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা বলেন, আমরা দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। অন্যথায় সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। যেহেতু প্রণোদনা, ঋণ কিছুই আমরা পাইনি, আবার স্কুলও খোলা হচ্ছে না, তাই আমরা বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মাছুম বিল্লাহ বলেন, সব নয়, তবে ভালো মানের কিন্ডারগার্টেনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ কারণে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে কিন্ডারগার্টেনের নিবন্ধন শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরিয়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। তবে ১৪ হাজার আবেদন জমা পড়েছে।
কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা নিয়ে নানা তথ্য রয়েছে। কিন্ডারগার্টেন মালিকদের একাধিক সংগঠনও রয়েছে। কোনো সংগঠন দাবি করছে এই সংখ্যা ৪০ হাজার। শিক্ষক ৬ লাখ এবং শিক্ষার্থী ৭০ থেকে ৮০ লাখ। আবার কোনো কোনো সংগঠন দাবি করছে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ৬০ হাজার, শিক্ষার্থী ১ কোটি এবং শিক্ষক ১০ লাখ। তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বই নিয়েছে। এর বাইরে প্লে, নার্সারি, কেজি শ্রেণি পড়ানো হয় এ সংখ্যা ১০ হাজারের সামান্য বেশি। সে হিসাবে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ৪০ হাজার।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান জানান, তার পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটিতে ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী ছিল। বাসাভাড়া ইতিমধ্যে সাড়ে ৩ লাখ বকেয়া পড়েছে। বাড়িওয়ালা বাসাভাড়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছে। শিক্ষকদেরও বেতন দিতে পারছি না। তিনি জানান, সরকার অটোপাসের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এখন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা আর টিউশন ফিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পরীক্ষার আগে হয়তো তাদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করা যেত। এখন আর সে আশা নেই।
ফার্মগেট এলাকায় ড্রিমল্যান্ড প্রিপারেটরি নামে একটি কিন্ডারগার্টের পরিচালনা করছেন আরেফিন। তিনি জানান, করোনার পর শিক্ষার্থীরা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষকরাও। টিউশন ফি পাচ্ছি না, শিক্ষকদের বেতন দিতেও পারছি না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আকরাম-আল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, যেসব কিন্ডারগার্টেন এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের শিক্ষার্থীরা বা যেসব অভিভাবক গ্রামে চলে গেছেন তারা তাদের সন্তানদের কাছাকাছি সরকারি স্কুলে টিসি ছাড়া ভর্তি করাতে পারবেন। এ ব্যাপারে আমরা এরই মধ্যে সার্কুলার জারি করেছি। তিনি বলেন, কোনো স্কুলের জন্য আলাদাভাবে কিছু ভাবার সুযোগ নেই। সব স্কুলই একসঙ্গে খুলবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারের কাছে কিন্ডারগার্টেনের চিত্র ভালো নয়। সরকার চাইছে শিক্ষার্থীদের সরকারি স্কুলে ফিরিয়ে আনতে। এ কারণে প্রথম শ্রেণির আগে দুই বছরের প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করবে। ফলে চার বছর বয়সে শিক্ষার্থীরা সরকার পরিচালিত স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাবে। ফলে ভালো মানের কিন্ডারগার্টেন স্কুল টিকে থাকবে। চিরতরে হারিয়ে যাবে নিম্নমানের কিন্ডার গার্টেন স্কুল।
