ভুবনখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টালির নাম বাংলাদেশের কোনো সচেতন মানুষের কাছেই অজানা নহে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে তিনি বিবিসির দিল্লি প্রতিনিধি হিসাবে যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে জানাইয়াছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মার্ক টালির সেই সংবাদ ছিল অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। তখন হইতেই বাংলাদেশের উপর তাহার একটি বিশেষ নজর রহিয়াছে।
সম্প্রতি তিনি বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি লইয়া ভারতের প্রখ্যাত দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে একখানা নিবন্ধ লিখিয়াছেন। অর্থবহ এই নিবন্ধে তিনি শুরুতেই একটি বাক্যে যাহা লিখিয়াছেন তাহার বাংলা ভাষান্তর করিলে হইবে— আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সম্ভবত ভারতকে ছাড়াইয়া যাইতেছে। বিষয়টি নজরে আসিয়াছে এই কারণে যে, দেশটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ছাইয়ের মধ্য হইতে ফিনিক্স পাখির মতো উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পোড়ানীতি অবলম্বন করিয়া ছাই রাখিয়া গিয়াছিল।
কিন্তু আজকের বাংলাদেশ যে একটি ভিন্ন দেশ তাহাই তিনি বর্ণনা করিয়াছেন। এই উন্নয়নের পেছনে যে প্রধান কারণ তাহা বর্ণনা করিতে গিয়া সরকারের দাতাদের পরামর্শ গ্রহণ ও প্রাইভেটাইজেশনের বিষয়ে আগ্রহের কথা বলিয়াছেন। ইহার সহিত পার্শ্ববর্তী দেশের সুসম্পর্কও কাজে দিয়াছে বলিয়া তিনি মনে করিয়াছেন। ইহার পাশাপাশি তিনি ইহাও মনে করাইয়া দিয়াছেন যে, এখনো ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করিতেছে, করোনাকালে রেমিট্যান্সের উপর আঘাত আসিতে পারে এবং টেক্সটাইল খাতে কঠিন প্রতিযোগিতা এমনকি বিশৃঙ্খলাও দেখা দিতে পারে।
মার্ক টালির কথা অস্বীকার করিবার বা অতিরিক্তি বলিয়া বিবেচনা করিবার কোনো কারণ নাই। বিগত প্রায় দুই দশক ধরিয়া যে অভাবিত উন্নয়ন ঘটিয়াছে তাহা শুধু মার্ক টালির নহে, দেশের অভ্যন্তরে থাকিয়া আমাদেরও চোখ এড়ায় নাই। দেশের যেই স্থানে কেবল জলা ছিল, সেইখানে চওড়া সড়ক হইয়াছে; যেইখানে কেবল কচুরিপানা ছিল, সেইখানে গড়িয়া উঠিয়াছে মাছের ঘের; যেই শহরে একটি বা দুইটি একতলা বাড়ি ছিল, সেইখানে এখন শত শত বহুতল ভবন। এই দৃশ্য সারা দেশেই আমরা দেখিতে পাই।
শুধু মার্ক টালি নহেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লইয়া বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাদের ইতিবাচক ডাটাই দিয়া যাইতেছে; কিন্তু তাহার পরও যে শঙ্কা নাই তাহা বলা যাইবে না। বিশেষ করিয়া করোনাকালে এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে একটি দীর্ঘকালীন নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে তাহা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। বাংলাদেশও এই নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে থাকিবে না। পাশাপাশি ইহাও মনে রাখা দরকার যে, কখনো কখনো অর্জন করার চাইতে অর্জন ধরিয়া রাখা অধিক কঠিন হইয়া পড়ে। সুতরাং উন্নয়ন অব্যাহত রাখিতে হইলে সর্বক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা প্রদর্শন করিতে হইবে। দেশকে দুর্নীতি হইতে যতটা সম্ভব মুক্ত করিতে চেষ্টা চালাইতে হইবে। প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করিতে হইবে। দেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে অধিকতর উত্সাহিত করিয়া তুলিতে হইবে। সর্বোপরি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে, হোক তাহা বৃহত্ অথবা ক্ষুদ্র পরিসরে, সরকারের সহায়তার হাত অব্যাহতভাবে প্রসারিত রাখিতে হইবে। আমরাও দেশ লইয়া আশাবাদী। ৮৫ বত্সর বয়সের মার্ক টালির জীবদ্দশাতেই যেন তিনি সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশ দেখিয়া যাইতে পারেন, সেই প্রচেষ্টায় সরকারকে প্রতিশ্রুতিশীল থাকিতেও আমাদের অনুরোধ থাকিবে।
