ইসরাত জাহান চৈতী
করোনা ভাইরাসের এই সময়ে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে সমাজের বয়স্ক মানুষগুলো। তারা না যেতে পারছে ঘরের বাইরে, না পারছে সারা দিন ঘরে বসে সময় কাটাতে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গেও দেখা নেই বহু দিন। আবার তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির প্ল্যাটফরমগুলোতেও অভ্যস্ত নয়। তাই এ সময় সবচেয়ে খারাপভাবে দিনযাপন করছেন আপনার-আমার পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিটি। এর মধ্যে আবার অনেক পরিচিতদের বিয়োগও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের মধ্যে।
বেলায়েত জামান (ছদ্মনাম) অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন এ বছরের শুরুর দিকে। অবসরের পর নাতি-নাতনিদের ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই সময় কাটছিল তার। হেসেখেলে আরাম করে, সকাল-বিকাল বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেশ আনন্দেই কাটছিল তার মুক্ত জীবন। কিন্তু হঠাত্ই যেন হানা দিয়ে বসল নোভেল করোনা ভাইরাস। হঠাত্ করেই পালটে গেল জীবনচিত্র। এখন বাসার বাইরে যাওয়া হয় না একদম, দেওয়া হয় না বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও। সারা দিন বাসায় বসেই দিনযাপন করছেন তিনি। করোনা ভাইরাস প্রাণ কেড়ে নিয়েছেন তার কাছের দুই বন্ধুর। এর ফলে হঠাত্ কেমন যেন পালটে গেছেন তিনি। সব সময় হাসিখুশি থাকা মানুষটি যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। প্রয়োজন ছাড়া খুব বেশি কথাও বলেন না। সব সময় যেন আতঙ্কগ্রস্ত তিনি, কোনো গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকেন যেন। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তার পরিবারের সদস্যরাও।
এ চিত্র শুধু একজন বেলায়েত জামানের নয়। ঘরে বসে থাকতে থাকতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন আমাদের সমাজের বয়স্ক মানুষগুলো। নানা রকম জটিল রোগও বাসা বাঁধছে তাদের শরীরে। এমনিতেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, বিভিন্ন ধরনের রোগ ও অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তাই এই মহামারির সময় পরিবারের প্রবীণ সদস্যের প্রতি দিতে হবে বাড়তি নজর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ডা. টেড্রস অ্যাডহানম গেব্রেইয়েসুস বলেছেন, এই মহামারি থেকে সমাজের প্রবীণদের রক্ষা করতে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ তারা আমাদের সমাজ ও পরিবারের মূল্যবান সম্পদ। তারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হলে গুরুতর অবস্থা হওয়ার ঝুঁকি রয়ে যায়।
এ অবস্থায় মহামারি থেকে সুস্থ রাখতে প্রবীণদের প্রতি পরিবারের সদস্যদের করণীয় :১. তাদের প্রতি অন্য সময়ের তুলনায় বাড়তি নজর দিতে হবে। ২. একঘেয়েমি দূর করতে নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সময় দিতে হবে। ৩. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয় তাই তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী মজুত রাখতে হবে। ৪. সহজেই যাতে ঘনঘন হাত ধুতে পারে সেজন্য বাথরুমসংযুক্ত ঘরে তাদের রাখতে হবে। ৫. তাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। ৬. তাদের ঘরটিতে যেন আলো-বাতাস সহজে প্রবেশ করতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। ৭. শারীরিক যে কোনো প্রয়োজনে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে এবং মানসিকভাবে সুস্থ রাখতেও চিকিত্সকের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। ৮. মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিষয়গুলো মেনে চললে সুস্থ থাকবে আমার-আপনার পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি। তাই কোভিড-১৯ এর এই খারাপ সময়ে সমাজের অতি মূল্যবান এই মানুষগুলোর প্রতি হতে হবে আমাদের বিশেষ যত্নবান। এর ফলেই সুস্থ পৃথিবীতে আমরা আবার তাদের নিয়ে বাঁচতে পারব সাবলীলভাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
