দেহরক্ষীসহ ইরফান তিন দিনের রিমান্ডে

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২০, ২২:৫০

নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ ও তার স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সাময়িক বরখাস্তকৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদুল ইসলামকে তিন দিন করে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূরের আদালত এই আদেশ দেন। এদিকে হাজি সেলিম ও তার ছেলে ইরফান সেলিমের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি করে মোট চারটি মামলা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা মামলা তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগে (ডিবি)। 

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে কারাগার থেকে ইরফান সেলিম ও জাহিদকে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূরের আদালত দুই আসামিকে ধানমন্ডি থানার মামলায় গ্রেফতার দেখায়। তারপর একই আদালতে দুই আসামির রিমান্ড শুনানি হয়। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাদের প্রত্যেকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে।

এর আগে গত মঙ্গলবার ধানমন্ডি থানার পরিদর্শক (মামলার তদন্ত কর্মকর্তা) আশফাক রাজীব হায়দার আসামি ইরফান সেলিম ও জাহিদকে গ্রেফতার দেখানোসহ সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন।

শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আবু বলেন, আসামিরা নিরীহ ব্যক্তিকে কেন এভাবে মারধর করল, আসামিদের রিমান্ডে নিলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিও আছে। তাদের পরিচয় জানতেও দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।

অন্যদিকে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী প্রাণনাথ রিমান্ডের বিরোধিতা করে বলেন, ‘ইরফান যে বাদীকে মেরেছে, এমন কথা এজাহারে বলা নাই। কে না কে মেরেছে, সেটা সুনির্দিষ্ট না।’ তিনি যোগ করেন, ‘বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বাসায় গেল। সব দেখে তাকে গ্রেপ্তার করল, সাজাও দিল। যা কিছু আছে, যা নাই, তাসহ সাজা হলো। মারামারির জন্য রিমান্ডের কী দরকার? প্রমাণ হলে সাজা হবে, না হলে খালাস পাবে। এখানে রিমান্ডের কিছু নাই।’

এই মামলার আরেক আসামি এ বি সিদ্দিক দীপুকে গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকেও তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছিলেন। আর তার আগের দিন ইরফানের গাড়ির চালক মিজানুর রহমানকে এক দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত।

চার মামলা তদন্তের নির্দেশ

ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি করে মোট চারটি মামলা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল বুধবার অস্ত্র আইনে দুটি মামলার এজাহার আদালতে পৌঁছালে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী তা গ্রহণ করে আগামী ১৭ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ইরফান ও জাহিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদ এজাহার গ্রহণ করে আগামী ৩ ডিসেম্বর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। র্যাবের দায়ের করা অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায়ও ইরফান ও জাহিদকে সাত দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় মামলা হওয়ার পর সোমবার চকবাজার দেবীদাস ঘাট লেন এলাকায় এমপি হাজি সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ছেলে ইরফান সেলিমকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরে মদ্যপান ও ওয়াকিটকি রাখায় তাকে এক বছরের সাজা দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার ডিএসসিসির কাউন্সিলর পদ থেকে ইরফানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর আগে ইরফান সেলিম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা হয়। নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ বাদী হয়ে সোমবার মামলা দায়ের করেন। এ মামলার আসামিরা হলেন ইরফান সেলিম, তার বডিগার্ড মোহাম্মদ জাহিদ, হাজি সেলিমের মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এ বি সিদ্দিক দীপু, গাড়িচালক মিজানুর রহমানসহ অজ্ঞাত আরো দুই-তিন জন। এই মামলায় এজাহারভুক্ত সব আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। দীপুকে এ মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

তথ্য সংগ্রহ করছে দুদক

হাজি সেলিম ও তার ছেলে ইরফান সেলিমের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেখানে দুদকের সিডিউলভুক্ত অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান করা হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান। গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

দুদক কমিশনার বলেন, ‘বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় হাজি সেলিম ও তার ছেলে ইরফান সেলিমের বিষয়ে আমরা সংবাদ দেখেছি। আমরা লক্ষ? করছি, বিষয়গুলো আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিষয়। তবে অবৈধ সম্পদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। অবৈধ সম্পদের বিষয়গুলো যদি দুদকের শিডিউলের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় এবং শিডিউলভুক্ত অপরাধের শামিল হয়, তাহলে আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব এবং দুদকের আইনে পরে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কমিশনার মোজাম্মেল বলেন, সরকারের জায়গা বা সম্পত্তি হোক, যদি দখল হয় তাহলে দুদক আইনের আওতাভুক্ত হলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।