সুরা নসর নাজিল হওয়ার পর যখন রাসুল (স.) বুঝলেন যে, তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে আসছে এবং আগামী হজে তার উপস্থিত থাকা সম্ভব হবে না, তখন তিনি হিজরির জিলহজ মাসের ৯ তারিখ রোজ শুক্রবার আরাফাতের ময়দানে লক্ষাধিক মুসলমানের উদ্দেশে বিদায় হজের ভাষণ দান করেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কেউ ইলাহ নেই, অর্থাত্ তিনিই হচ্ছেন একমাত্র সার্বভৌমত্বের মালিক এবং তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বা তার সমকক্ষ কেউ নেই। হে আল্লাহর বান্দাগণ, আমি তোমাদের আল্লাহর ইবাদত করার অসিয়ত করছি এবং এর ওপর নির্দেশ দান করছি। আজ তোমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম তোমাদের দিন, পরিপূর্ণ করলাম তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত এবং তোমাদের জন্য দিনরূপে মনোনীত করলাম ইসলামকে।’ তিনি বললেন, ‘হে লোকেরা, আমার কথা শোনো, আমি তোমাদের কাছে স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি। কেননা, আমি জানি না হয়তো এ বছরের পরে আমার এই স্থানে তোমাদের সঙ্গে আর সাক্ষাত্ হবে না। তোমরা আমার কথাগুলো মনোযোগসহকারে শোনো। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তার প্রশংসা করছি। তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি এবং তার কাছে আশ্রয়প্রার্থনা করছি আমাদের মনের কদর্যতা হতে এবং আমাদের মন্দ আমল হতে। আল্লাহ যাকে পথ দেখান, তাকে কেউ পথহারা করতে পারে না। তিনি যাকে পথহারা করেন, কেউ তাকে পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এক আল্লাহ ব্যতিত কোনো ইলাহ নেই এবং তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। আমি আরো সাক্ষ দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স.) তার বান্দা ও রাসুল। আমি তোমাদের অসিয়ত করছি, হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহকে ভয় করো, তোমাদের তার আনুগত্য স্বীকার করতে। আজ থেকে জাহেলি যুগের সুদপ্রথার অবসান হলো। তবে তোমরা তোমাদের মূলধন পাবে। তোমরাও জুলুম করবে না। তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না। আল্লাহর ফয়সালা, আর কোনো সুদ নেই। কাবাঘরের খিদমত এবং হাজিদের পানি খাওয়ানো ব্যতীত জাহেলি যুগের সব প্রথার অবসান করা হলো। মনোযোগসহকারে শোনো, এখন থেকে আর আরবে শয়তানের পূজা করা হবে না।
ধর্মীয় ব্যাপারে তোমরা শয়তানের প্রভাব থেকে দূরে থাকবে। হে মানুষ, মহিলাদের ওপর তোমাদের অধিকার রয়েছে। তোমাদের ওপরও মহিলাদের অধিকার রয়েছে। মহিলাদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো তারা অন্য পুরুষকে তাদের কাছে আসতে দেবে না। এটা তোমাদের জন্য ক্রোধ ও ক্ষোভের কারণ হবে। মহিলাদের নির্লজ্জতা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। যদি তারা এরূপ করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন তোমরা তাদের আলাদা শয্যায় শুতে দেবে এবং মৃদু শাস্তি দেবে। অতঃপর তারা সংশোধিত হলে তাদের পানাহারের দিকে লক্ষ রাখবে। মহিলাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করবে। তারা তোমাদের সাহায্যকারী। তারা নিজেদের জন্য কিছুই রাখে না। তোমরা আল্লাহ তায়ালার এই আমানতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছ।
আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত বাক্যের মাধ্যমে তাদের নিজেদের জন্য বৈধ করে নিয়েছ। হে আদমসন্তান, তোমরা সাবধান হও, অপরাধীর সমস্ত বোঝা অপরাধীকেই বহন করতে হবে। পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে দায়ী করা চলবে না। তোমরা স্মরণ রাখো, সমগ্র মানবজাতি আদমের বংশধর এবং কর্দমাক্ত মৃত্তিকা থেকে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা আরো স্মরণ রাখো, বাসভূমি, বর্ণ ও গোত্রনির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলিম পরস্পর ভাই। এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃসমাজ এবং সমপর্যায়ভুক্ত। আজ থেকে বংশগৌরব প্রথা বিলুপ্ত করা হলো। যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে কুলীন, সে স্বীয় কাজের দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনুরূপ অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার কোনো প্রাধান্য নেই। তোমরা দাস-দাসী বা অধীনস্তদের সম্পর্কে সতর্ক হও। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। তাদের নির্যাতন করার অধিকার তোমাদের নেই। নিজে যা খাবে ও পরিধান করবে, তা তাদের খাওয়াবে এবং পরাবে। অপরাধ করলে মার্জনা করবে অথবা মুক্তিদান করবে। স্মরণ রেখো, তারাও তোমাদের মতো মানুষ এবং আল্লাহর সৃষ্টি। তোমরা মনে রেখো, তোমাদের রক্ত, তোমাদের ইজ্জত, তোমাদের সম্পদ একে অপরের জন্য চিরদিনের মতো হারাম করে দেওয়া হলো। যেমন আজকের এই দিন, এই মাস, তোমাদের এই শহর সবার জন্য হারাম। অর্থাত্ মানুষের জীবন, মান-ইজ্জত, ধন-সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তার ঘোষণা দেওয়া হলো। যে তিনটি জিনিসের নিরাপত্তার অভাবে সমাজে চরম অশান্তি নেমে আসে, তার পরিসমাপ্তি ঘটানো হলো। ফলে এখন থেকে যাবতীয় ভয়ভীতি দূর করা হলো এবং পরিপূর্ণ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হলো। এটা সম্ভব হলো একটানা দীর্ঘ ২৩ বছরের বিরামহীন সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে। সাবধান, তোমরা ধর্মীয় ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করবে না। ধর্মের সঠিক বন্ধনসমূহ অতিক্রম করার কারণে তোমাদের পূর্বে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
n লেখক :বিমা কর্মকর্তা
