পরিবহন শ্রমিকদের নৃশংসতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি নৃশংসতার ঘটনাই নির্মম ও বীভত্স প্রকৃতির। এসব নৃশংসতার মধ্যে রয়েছে বাসের মধ্যে নারী যাত্রীকে একা পেয়ে ধর্ষণ, হত্যা ও লাশ জঙ্গলে ফেলা, বাস থেকে যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা ইত্যাদি। এ ধরনের নানা নৃশংসতার ঘটনার একটির শিকার হয়েছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েল। তাকে বাস থেকে নদীতে ফেলে হত্যার দায়ে তিন পরিবহন শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন হানিফ পরিবহনের বাসচালক জামাল হোসেন, চালকের সহকারী ফয়সাল হোসেন ও সুপারভাইজার মো. জনি। এদের মধ্যে জামাল ও ফয়সাল সহোদর। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। এ সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, এ রকম অনেক পায়েল মারা যায়, যাদের কথা আমরা জানতে পারি না। সড়ক দুর্ঘটনায় যেভাবে মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে তা দিন দিন হত্যার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, যা বলাটা বোধ হয় ভুল নয়। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ গাড়িচালক, গাড়ি চলাচলের অনুপযুক্ত রাস্তা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণেই প্রতিনিয়তই এ দুর্ঘটনা ঘটছে ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি সড়ক যেন হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন এত মানুষের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা, নাকি হত্যা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকেও পিষে দিতে এরা দ্বিধাবোধ করছে না। দিনে দিনে সড়কে দীর্ঘায়িত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। কোনোভাবেই এই মৃত্যুর মিছিল থামছে না। সড়কে প্রতিদিন এত মৃত্যু এখনো আমাদের সচেতন করে না।
পরিবহন শ্রমিকদের নির্মমতার শিকার পায়েল
রায়ে বিচারক বলেন, ভিকটিম পায়েল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন মেধাবী ও প্রতিভাবান ছাত্র ছিল। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে সে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার জন্য নিজেকে তৈরি করছিল। সেই মুহূর্তে বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপারের নির্মমতার শিকার হয়ে তাকে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে। তার এ অকাল মৃত্যুতে তার পরিবার আজ শোকে নির্বাক ও হতাশায় নিমজ্জিত। ছেলে হারানোর এই শোক কোনোভাবেই সামলানো সম্ভব নয় বিধায় নির্মম এই খুনের জন্য সব আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো।
চার দফা সুপারিশ
রায়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চার দফা সুপারিশ করেছে ট্রাইব্যুনাল। এগুলো হচ্ছে এক. গাড়ি ছাড়ার পূর্বে চালক, সুপারভাইজার এবং চালকের সহকারী মাদকাসক্ত কি-না, সে জন্য তাদের প্রত্যেককেই ডোপ টেস্ট করাতে হবে। দুই. বাসের চালক, সুপারভাইজার এবং চালকের সহকারীরা প্রায়শই যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। যাত্রীদের সঙ্গে নম্র ও ভদ্র আচরণ করতে হবে। চালকসহ অন্যদের গাড়ি চালানোর বিষয় এবং যাত্রীদের সঙ্গে আচরণ সংক্রান্ত কাউন্সেলিং বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তিন. মহাসড়কের প্রতি তিন কিলোমিটার পরপর যাত্রীসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক আধুনিক বাথরুম স্থাপন করতে হবে। চার. ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) মাধ্যমে মহাসড়কে যান চলাচলের ওপর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে মনে করেন নাগরিকরা।
ঘটনার বৃত্তান্ত
২০১৮ সালের ২১ জুলাই রাতে চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে দুই বন্ধু হাকিমুর রহমান আদর ও মহিউদ্দিন শান্তর সঙ্গে পায়েল হানিফ পরিবহনের একটি বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। দুই দিন পর ২৩ জুলাই মুন্সীগঞ্জের ভাটেরচর সেতুর নিচের খাল থেকে পায়েলের মরদেহ উদ্ধার করে গজারিয়া থানা পুলিশ। এ ঘটনায় ঐ বছরের ২৪ জুলাই পায়েলের মামা গোলাম সরোয়ার্দী বিপ্লব বাদী হয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এর পরই তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে দুই জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তারা বলেন, ঘটনার রাতে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকার রাস্তায় হালকা যানজট ছিল। যানজট ছাড়লে ড্রাইভার জামাল হোসেন বাসটি চালিয়ে ভাটেরচর ব্রিজের ওপর ওঠায়। পায়েল বাস মিস করার ভয়ে প্রস্রাব শেষ করে বাস ধরার জন্য দৌড় দেন। সুপারভাইজার জনি ড্রাইভারকে বাসের গেট খুলে দিতে বলেন। পায়েল বাসের গেটের কাছাকাছি গেলে জামাল বাসের অটো সুইচ দিয়ে গেট খুলে দেন। তখন বাসের গেট পায়েলের মুখের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। পায়েল ব্রিজের ওপর পড়ে যান। ব্রিজের আইল্যান্ডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পায়েলের মুখ ও নাকে জখম হয়। এতে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। এ সময় পায়েলের দুই বন্ধু ও বাসের অন্য যাত্রীরা ঘুমিয়ে ছিলেন। যাত্রীরা কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে পায়েলকে চিকিত্সার জন্য নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে না নিয়ে ভাটেরচর ব্রিজ থেকে ফুলদী নদীতে ফেলে দেয় আসামিরা। যদিও ঐ সময় পায়েল জীবিত ছিল। দুর্ঘটনার দায় এড়াতে তারা এমন কাজ করেন বলে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। এছাড়া সেতু থেকে খালে ফেলে দেওয়ার আগে পায়েলের পরিচয় গোপন করতে তার মুখ থেঁতলে দেওয়া হয়। বাস থেকে নামার সময় তার মুঠোফোনটিও বাসের আসনে ছিল। এ সময় তার বন্ধুরা ঘুমিয়ে ছিল। পরে বাসকর্মীদের কাছে পায়েলের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে আসামিরা বলেন, সে রাস্তায় নেমেছে, পরের গাড়িতে আসবে।
এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা তদন্ত শেষে ঐ বছরের ৩ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। প্রথমে মুন্সীগঞ্জে মামলার বিচারকাজ শুরু হলেও পরে পরিবারের আবেদনে ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বদলি হয়। কিন্তু করোনাকালে পাঁচ মাস মামলার বিচারকাজ বন্ধ থাকে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতির পর পুনরায় বিচারকাজ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষে গতকাল চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেছে আদালত।
পায়েল হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে বিচারক বলেন, পরস্পর যোগসাজশে আসামিরা পায়েলকে হত্যা করে লাশ গুম করার জন্য ভাটেরচর সেতু থেকে ফুলদী নদীতে ফেলে দেন। গোপন তদন্তে প্রকাশ পায় যে তখনো পায়েল বেঁচে ছিলেন। ঘটনার বিষয়ে কোনো যাত্রী জানার আগেই আসামিরা বাসটি চালিয়ে ঢাকার দিকে চলে যান।
রাষ্ট্রপক্ষে স্পেশাল পিপি আবু আব্দুল্লাহ ভুইয়া ও আসামি পক্ষে আবুল কালাম আজাদ মামলা পরিচালনা করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে নিহত পায়েলের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে পায়েলের মা কোহিনুর বেগম বলেন, আমাদের চাওয়া রায়টা যেন দ্রুততম সময়ে কার্যকর হয়। তবে চালক জামালের স্ত্রী সাথী বেগম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমার স্বামী ও দেবর নির্দোষ। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত পায়েলের সহপাঠী ও বন্ধুরা সমস্বরে চিত্কার করে বলে ওঠেন, ‘উই গট জাস্টিস’।
