বরেণ্য সাহিত্য সম্পাদক, কবি আবুল হাসনাতের প্রয়াণ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২০, ২২:৫৭

প্রখ্যাত সাহিত্য-সম্পাদক, চিত্রসমালোচক, কবি আবুল হাসনাত (৭৫) আর নেই। গতকাল রবিবার সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। তার মৃত্যুতে সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।

আবুল হাসনাত সাহিত্যিক সুনামকে ছাপিয়ে গেছে তার সাহিত্য সম্পাদক পরিচয়। বাঙালি মধ্যবিত্তের সাহিত্য রুচি নির্মাণে তার অবদান অনস্বীকার্য। অনেক নবীন কবি, সাহিত্যিক তার হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। নতুন লেখকদের পাঠকের সামনে তুলে ধরবার কাজটি তিনি সারাজীবন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে করে এসেছেন। প্রথমে দৈনিক সংবাদে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে পরে কালি ও কলম এর সম্পাদক হিসেবে তিনি আমৃত্যু নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আবুল হাসনাত ছায়ানট ট্রাস্টেরও সদস্য ছিলেন। এই ছায়ানট ট্রাস্ট পরিচালিত নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতিও ছিলেন তিনি।

আবুল হাসনাতের পারিবারিক সূত্র জানায়, তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। গতকাল বাদ আসর ধানমন্ডির ঈদগাহ জামে মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আবুল হাসনাতের স্ত্রী নাসিমুন আরা হক মিনুও সাংবাদিকতা করেন। তিনি এক মেয়ে দিঠি হাসনাতসহ আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশে প্রগতিশীল ও মুক্ত সংস্কৃতি চর্চায় আবুল হাসনাতের অবদান জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। এছাড়াও, শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন। এছাড়াও তার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন।

সকালে আবুল হাসনাতের মরদেহ ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয় ও ছায়ানট প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। এ দুই স্থানেই সর্বস্তরের মানুষ তাকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। বেঙ্গল শিল্পালয়ে ফুলেল শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু, মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, দৃকের পরিচালক আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, কবি পিয়াস মজিদ, সাহিত্যিক স্বকৃত নোমান, লেখক মোজাফফর হোসেন প্রমুখ।

পরে ছায়ানট ভবনে শ্রদ্ধা জানান ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী, সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা, সঙ্গীতশিল্পী বুলবুল ইসলাম, শারমীন সাথী ইসলাম ময়না, পার্থ তানভীর নভেদ প্রমুখ। এরপর তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার ধানমন্ডির বাসভবনে।

নন্দিত সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী দীর্ঘ ২৪ বছর সুনামের সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন। তার নেতৃত্বে কালি ও কলম এবং বেঙ্গল পাবলিকেশন প্রকাশনা জগতে বিশেষ স্থান অর্জন করেছে। তিনি চিত্রকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘শিল্প ও শিল্পী’রও সম্পাদক ছিলেন। তিনি মাহমুদ আল জামান নামেও লেখালেখি করতেন।

আবুল হাসনাত ১৯৪৫ সালের ১৪ জুলাই পুরান ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘জ্যোত্স্না ও দুর্বিপাক’, ‘কোনো একদিন ভুবনডাঙায়’, ‘ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল’। শিশু ও কিশোরদের নিয়ে রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘টুকু ও সমুদ্রের গল্প’, ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে’, ‘রানুর দুঃখ-ভালোবাসা’। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ হলো সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য, জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন ও অন্যান্য। আবুল হাসনাত ১৯৮২ সালে টুকু ও সমুদ্রের গল্পের জন্য অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। আর ২০১৪ সালে অর্জন করেন বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলো।